সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চ ছেড়ে দেশের সেবায় লেফটেন্যান্ট গরিমা, ভাঙলেন সামাজিক গোঁড়ামি

আমাদের সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম, যাঁরা সামাজিক বাঁধা-ধরা নিয়মকে উপেক্ষা করে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সাহস রাখেন। লেফটেন্যান্ট গরিমা যাদব সেই ব্যতিক্রমীদের মধ্যে একজন। সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় উজ্জ্বল কেরিয়ার গড়ার হাতছানি উপেক্ষা করে দেশের সেবাকেই তিনি জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাঁর এই ব্যতিক্রমী পথচলা দৃঢ় সংকল্প, সাহস এবং গভীর দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যা সেই সমস্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষদের জন্য অনুপ্রেরণা, যাঁরা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে দেশের সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে চান।

গরিমা যাদবের শিক্ষাজীবন শুরু হয় শিমলার আর্মি পাবলিক স্কুলে। এরপর তিনি নয়াদিল্লির বিখ্যাত সেন্ট স্টিফেনস কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৭ সালে তাঁর জীবনে এক নতুন মোড় আসে, যখন তিনি ‘ইন্ডিয়াস মিস চার্মিং ফেস’ নামক একটি জাতীয় স্তরের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। এই সাফল্যের হাত ধরে তিনি ইতালিতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পান।

তবে, গ্ল্যামার জগতের হাতছানি তাঁকে বাঁধতে পারেনি। দেশের প্রতি গভীর টান অনুভব করে গরিমা সেই লোভনীয় আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজেকে দেশের সেবায় নিয়োজিত করার দৃঢ় সংকল্প নেন। প্রথমে তাঁর স্বপ্ন ছিল ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় (আইএএস) যোগদান করা। সেই লক্ষ্যে তিনি ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (ইউপিএসসি) পরীক্ষায়ও অংশ নেন, কিন্তু প্রথম চেষ্টায় সাফল্য পাননি।

তবে গরিমা হতাশ হওয়ার পাত্রী নন। তিনি তাঁর লক্ষ্য পরিবর্তন না করে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা পরিষেবা (সিডিএস) পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং অ্যাকাডেমি (ওটিএ)-তে দীর্ঘ ১১ মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করার পর, ২০১৯ সালের ৯ মার্চ তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন।

গরিমার এই অসাধারণ যাত্রায় সবচেয়ে বড় স্তম্ভ ছিলেন তাঁর মা। মেয়েকে একা হাতে বড় করেছেন তিনি, কিন্তু কখনোই মেয়ের স্বপ্ন পূরণে বাধা দেননি। জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে, প্রতিটি ভাঙাগড়ায় তিনি ছিলেন মেয়ের পাশে। সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া থেকে শুরু করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট পদের দায়িত্ব গ্রহণ – প্রতিটি পদক্ষেপে গরিমা তাঁর মায়ের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সাহস জুগিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় গরিমা তাঁর প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, “আবহাওয়াও প্রতিকূল ছিল, আমার শারীরিক গঠনও খুব একটা ভাল ছিল না। কিন্তু প্রথম কয়েক মাস কোনওভাবে সামলে নিলাম। হাল ছাড়িনি এবং অনেক উন্নতি করেছি।” তাঁর এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, কতটা কঠোর পরিশ্রম এবং একাগ্রতার মাধ্যমে তিনি তাঁর লক্ষ্য অর্জন করেছেন।

লেফটেন্যান্ট গরিমা যাদবের গল্প সেই সমাজের মুখে এক সজোরা থাপ্পড়, যেখানে মেয়েদের শুধুমাত্র সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন নারী চাইলে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চের বাইরেও দেশের জন্য অনেক বড় অবদান রাখতে পারেন। তাঁর জীবনকাহিনী নিঃসন্দেহে বহু তরুণ প্রজন্মের কাছে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং তাঁদের দেশ সেবায় উদ্বুদ্ধ করবে।