ডোনাল্ড ট্রাম্পের DOGE টিম থেকে সরছেন? বড় ইঙ্গিত দিলেন ইলন মাস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং প্রযুক্তি জগতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ইলন মাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি আগামী মে মাসের শেষের দিকে সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে গঠিত সংস্থা ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি (DOGE)-এর প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। বিলিয়নেয়ার এই ব্যবসায়ী দাবি করেছেন যে তার নেতৃত্বাধীন টিম ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি এক ট্রিলিয়ন ডলার কমিয়ে এনেছে, যার ফলে বর্তমানে মোট ফেডারেল ব্যয় প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
সম্প্রতি একটি খ্যাতনামা মিডিয়া হাউস আয়োজিত অনুষ্ঠানে DOGE প্রধান ইলন মাস্ক তার কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সহকর্মীকে নিয়ে অংশ নেন। সেখানে তারা মার্কিন অর্থনীতির উন্নতি এবং ফেডারেল ঘাটতি অর্ধেকে নামিয়ে আনার জন্য তাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে সরকারি ব্যয় সংকোচনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন ইলন মাস্ক। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “এখন আমার কাজ শেষ।” তিনি জানান, তার সুদক্ষ দল প্রতিদিন গড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রায় ১৩০ দিনের মধ্যেই এক ট্রিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের অভূতপূর্ব লক্ষ্য অর্জন করেছে।
মাস্ক আরও বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রতিদিন ৪ বিলিয়ন ডলার অপচয় কমানো এবং আমরা অত্যন্ত সাফল্যের সাথে সেই কাজটি সম্পন্ন করেছি। যদি এই কঠোর প্রচেষ্টা সফল না হতো, তাহলে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল।” তার মতে, DOGE-এর বর্তমান কার্যক্রম মে মাসের শেষ নাগাদ সমাপ্ত হতে পারে।
DOGE-এর প্রধান ইলন মাস্ক এবং তার সাতজন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী – আরাম মোগাদ্দাসি, স্টিভ ডেভিস, ব্র্যাড স্মিথ, অ্যান্থনি আর্মস্ট্রং, জো গেবিয়া, টম ক্রাউস এবং টাইলার হ্যাসেন – সরকারি সংস্থাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অপচয়, দুর্নীতি এবং বিভিন্ন অনিয়ম দূর করার জন্য তাদের গৃহীত সাহসী পদক্ষেপগুলোর কথাও অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন।
DOGE-এর উল্লেখযোগ্য অর্জন:
DOGE-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ, যার মধ্যে কর্মী সংখ্যা হ্রাস, অব্যবহৃত সরকারি সম্পদ বিক্রি এবং একাধিক অপ্রয়োজনীয় চুক্তি বাতিল করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত ছিল, চলতি বছরের ২৪শে মার্চ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে। মাস্ক এই প্রসঙ্গে বলেন, “মার্কিন সরকারের কর্মদক্ষতা ব্যাপকভাবে উন্নত করার জরুরি প্রয়োজন ছিল, কারণ এটি দীর্ঘদিন ধরে অপচয় এবং জালিয়াতিতে পরিপূর্ণ ছিল। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ১৫ শতাংশ ব্যয় হ্রাস কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পরিষেবার উপর সামান্যতম প্রভাবও ফেলবে না।”
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমেরিকা খুব শীঘ্রই আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। সাধারণ মানুষ যে অত্যাবশ্যকীয় সরকারি কর্মসূচির উপর নির্ভরশীল, সেগুলো আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে। হ্যাঁ, এই সময়ে অনেক সমালোচনা এবং অভিযোগ থাকবে, কিন্তু আমরা আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে অবিচলভাবে এগিয়ে চলেছি।”
টেসলার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের মধ্যেই মাস্কের এই ঘোষণা:
DOGE-এর প্রধানের পদ থেকে মাস্কের সম্ভাব্য পদত্যাগের এই খবর এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন আমেরিকায় তার বিখ্যাত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণকারী সংস্থা টেসলার বিরুদ্ধে ব্যাপক শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে। গত এক মাসে টেসলার শেয়ারের দামে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে, যা গত সোমবার ৫ শতাংশের বেশি ছিল। অস্টিনে টেসলার কর্মীদের সাথে এক আলোচনা সভায় মাস্ক নিজেই স্বীকার করেছেন, “আমি সত্যিই অনেক কিছু নিয়ে ঝামেলায় আছি। বর্তমানে আমার ১৭টি ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।”
মাস্ক টেসলার বিরুদ্ধে সংগঠিত আক্রমণ এবং ভাঙচুরের বেশ কিছু ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “যখন আমি টেলিভিশনে এই ঘটনাগুলোর খবর দেখি, তখন মনে হয় যেন এক মহাপ্রলয় (আরমাগেডন) নেমে এসেছে।” তবে তিনি কর্মীদের আশ্বস্ত করে বলেন যে পরিস্থিতি মাঝে মাঝে ওঠানামা করে এবং কিছু কঠিন সময়ও আসে… “কিন্তু আমি আপনাদের সকলকে এই কথা দিতে চাই যে আমাদের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং রোমাঞ্চকর। আমরা এমন কিছু করতে চলেছি যা সম্ভবত এর আগে কেউ কল্পনাও করেনি।”
মাস্কের সামনে আইনি চ্যালেঞ্জ:
DOGE-এর কার্যকারিতা নিয়ে ইতিমধ্যেই মাস্কের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আইনি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে যে DOGE যথাযথ আইনি কর্তৃত্ব ছাড়াই কাজ করছে এবং গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘন করেছে। তবে, মাস্ক দৃঢ়ভাবে এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং সরকারি ব্যয় হ্রাসের পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ ন্যায্য বলে দাবি করেছেন। মাস্কের দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারে স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা আনয়নের জন্য কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া অপরিহার্য ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে ফেডারেল বাজেট ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে।
DOGE-এর কার্যক্রম একদিকে যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে তীব্র সমালোচনারও সম্মুখীন হয়েছে। এখন এটাই দেখার বিষয় যে ইলন মাস্ক সত্যিই মে মাসের শেষের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে DOGE-এর দায়িত্ব ত্যাগ করেন কিনা এবং তার প্রবর্তিত সংস্কারগুলির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মার্কিন সরকারের আর্থিক স্থিতিশীলতার উপর কেমন পড়ে।
DOGE কী?
DOGE (ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি) হল মার্কিন সরকার কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষ সংস্থা, যার প্রধান উদ্দেশ্য হল সরকারি ব্যয় হ্রাস করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে এই সংস্থাটি তৈরি করা হয় এবং এর নেতৃত্বভার দেওয়া হয় ইলন মাস্কের উপর। DOGE-এর মূল লক্ষ্য ছিল সরকারি বিভিন্ন বিভাগ এবং দফতরে বিদ্যমান অপ্রয়োজনীয় খরচ, দুর্নীতি এবং আর্থিক অপচয় কমিয়ে এনে সামগ্রিকভাবে ফেডারেল বাজেট ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, মাস্ক এবং তার দল বেশ কিছু সরকারি চুক্তি বাতিল করে, অব্যবহৃত সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারকে আরও বেশি কর্মক্ষম এবং স্বচ্ছ করে তোলা, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।