“ধর্ষকদের রাসায়নিক দিয়ে নপুংসক করা হবে?”-মহিলা সুরক্ষায় আবেদন পড়লো সুপ্রিম কোর্টে

২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ডের ১২ বছর পরেও দেশে মহিলাদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের ঘটনা অব্যাহত থাকায়, মহিলাদের সার্বিক সুরক্ষার জন্য প্যান-ইন্ডিয়া নির্দেশিকা জারির দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি নতুন জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করা হয়েছে। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে শীর্ষ আদালত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে বিনামূল্যে অনলাইন পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধকরণ, যৌন অপরাধীদের রাসায়নিক কাস্টেশন এবং জামিনের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের মতো প্রস্তাবগুলির বিষয়ে নোটিশ পাঠিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ:

বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়ার ডিভিশন বেঞ্চ এই মামলার শুনানিতে আবেদনকারীর কিছু প্রস্তাবকে ‘উদ্ভাবনী ও প্রশংসনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে, কিছু প্রস্তাব ‘অত্যন্ত কঠোর’ বলেও মন্তব্য করেছেন আদালত। বেঞ্চ বিশেষত গণপরিবহনে সামাজিক আচরণবিধির নির্দেশিকা জারির প্রস্তাবটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, “গণপরিবহনে সামাজিক আচরণের জন্য নির্দেশিকা জারি করার প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্দেশিকা শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় নয়, বরং শিক্ষামূলকও। এটি বাস, মেট্রো, রেলওয়ে এবং বিমানবন্দরগুলিতে প্রদর্শন করা উচিত।”

আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা:

শুনানির সময় প্রবীণ আইনজীবী মহালক্ষ্মী পাভানি কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এই ঘটনার পরে আরও ৯৪টি একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন। উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসে আরজি কর হাসপাতালের সেমিনার হলে ৩১ বছর বয়সী এক মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছিল, যা রাজ্য তথা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

আবেদনের মূল প্রস্তাব:

আবেদনে মহিলাদের সুরক্ষা এবং যৌন অপরাধ দমনের লক্ষ্যে বেশ কিছু কঠোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেগুলি হল:

রাসায়নিক কাস্টেশন: যৌন অপরাধীদের শাস্তি হিসেবে রাসায়নিক কাস্টেশন (Chemical Castration) চালু করা।

জামিনের বিধিনিষেধ: মহিলাদের বিরুদ্ধে হিংসার মামলায় অভিযুক্তদের জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা।

প্যান-ইন্ডিয়া নির্দেশিকা: গণপরিবহন এবং অন্যান্য জনবহুল স্থানে মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য দেশব্যাপী সামাজিক আচরণবিধি তৈরি করা এবং তার প্রচার করা।

তৃতীয় লিঙ্গের সুরক্ষা: তৃতীয় লিঙ্গের মানুষজনের সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং মর্যাদার অধিকার সুনিশ্চিত করা।
শীর্ষ আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ:

আদালত জানিয়েছে যে, “শাস্তিমূলক আইন ও দণ্ডবিধি কার্যকর করার ক্ষেত্রে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।” এই মামলার পরবর্তী শুনানি ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হবে।

সামাজিক বার্তা:

২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ডের পর ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইন আরও কঠোর করা হলেও, তার বাস্তবায়ন এখনও একটি বড় প্রশ্ন। আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা সহ সাম্প্রতিক ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে মহিলাদের সুরক্ষার জন্য শুধু আইন তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, সেই আইনের সঠিক বাস্তবায়ন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিকতার পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।