৬৮ বছর বয়সে প্রয়াত মেসির বাবা, ভুগছিলেন মারণ ব্যাধি ক্যানসারে

বিশ্ব ফুটবলে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। প্রয়াত হলেন কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।
স্পেনের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘ইনফোবে’ (Infobae)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৭ আগস্ট আর্জেন্টিনার রোসারিয়োর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। গত বেশ কিছুদিন ধরেই মারাত্মক ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন হোর্হে। অসুস্থতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁকে রোসারিয়োর একটি স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়েছিল, সেখানেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। হোর্হের প্রয়াণের খবর প্রকাশ্যে আসতেই মেসি পরিবারে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করা হয়নি, তবে মেসির পরিবারের ঘনিষ্ঠ বৃত্ত এবং আর্জেন্টিনার ফুটবলার নিকো পাস সোশ্যাল মিডিয়ায় সমবেদনা জানিয়ে লিখেছেন, “Rest In Peace Jorge Messi”।
মেসির কেরিয়ারের নেপথ্য কারিগর
লিওনেল মেসির বর্ণময় ফুটবল জীবনের পিছনে তাঁর বাবা হোর্হের অবদান ছিল অপরিসীম। কেবল জন্মদাতা পিতাই নন, মেসির কেরিয়ারের শুরু থেকে তাঁর এজেন্ট এবং সমস্ত ব্যবসায়িক দিক সামলানোর মূল দায়িত্ব ছিল হোর্হের কাঁধেই। মাঠে মেসির সাফল্যের অন্যতম বড় অনুঘটক ও মানসিক শক্তি ছিলেন এই মানুষটিই।
আর্জেন্টিনার রোসারিয়োতেই জন্ম হয়েছিল হোর্হে মেসির। যখন মেসি খুব ছোট, তখন তিনি একটি ইস্পাত কারখানায় ম্যানেজারের কাজ করতেন। কিন্তু ছেলের অবিশ্বাস্য ফুটবল প্রতিভা দেখে তিনি নিজের কেরিয়ার ও গোছানো জীবনকে পাশে সরিয়ে পুরো মনোযোগ দেন ছেলেকে নিয়ে।
মেসির বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, সেই সময় যাবতীয় ঝুঁকি নিয়ে ছেলেকে নিয়ে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন হোর্হে। লক্ষ্য ছিল একটাই—প্রতিভাবান ছেলেকে ইউরোপের কোনও বড় ক্লাবে সুযোগ করে দেওয়া। সেই অদম্য জেদের ফলেই স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনার নজরে আসেন মেসি।
ছোটবেলায় মেসির শারীরিক বৃদ্ধির (Growth Hormone Deficiency) সমস্যা ধরা পড়েছিল, যার ব্যয়বহুল চিকিৎসা পরিবারের পক্ষে বহন করা অসম্ভব ছিল। বার্সেলোনার সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমেই সেই প্রয়োজনীয় হরমোন চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। এরপরের ইতিহাস সবারই জানা—সেই অসুস্থ কিশোরই পরবর্তীকালে বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদিত সম্রাট হয়ে ওঠেন।
প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা এক অভিভাবক
ছেলের ফুটবল চুক্তি, স্পনসরশিপ ও সমস্ত আর্থিক সিদ্ধান্ত নিখুঁতভাবে সামলাতেন হোর্হে মেসি। মাঠের বাইরের যাবতীয় বিতর্ক ও চাপ থেকে ছেলেকে সবসময় আড়ালে রেখে তাঁকে শুধু ফুটবলে ফোকাস করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও চর্চিত ফুটবলারের বাবা হওয়া সত্ত্বেও হোর্হে বরাবরই প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে খুব একটা মুখ খুলতেন না, বরং ছেলের সাফল্যকেই জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি বলে মনে করতেন।
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সময় মেসির পরিবারের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল যে হোর্হে মেসি গুরুতর অসুস্থ এবং চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরবর্তীতে জানা যায়, মারণ ক্যানসার বাসা বেঁধেছে তাঁর শরীরে।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্ত্রী সেলিয়া কুচ্চিত্তিনির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন ছিল। রেখে গেলেন চার সন্তান—রদ্রিগো, মাতিয়াস, বিশ্বখ্যাত ফুটবলার লিওনেল মেসি এবং মারিয়া সোলকে।
আজ লিওনেল মেসি বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় অবস্থান করছেন, কিন্তু সেই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানোর সিঁড়ি তৈরি করে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা হোর্হে মেসি। তাঁর প্রয়াণে ফুটবল বিশ্ব হারাল এক নেপথ্য নায়ককে।