পৃথিবীতেই তৈরি হচ্ছে ‘মিনি সূর্য’! শক্তির অভাব মেটাতে জার্মানির এই মেগা প্রজেক্ট দেখলে চোখ কপালে উঠবে

সূর্যের মতো অপার শক্তির উৎস এবার ধরা দিতে চলেছে মানুষের হাতে। নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীতেই কৃত্রিম উপায়ে ‘মিনি সূর্য’ তৈরির কাজ আরও জোরদার করেছে জার্মানি। ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মেটাতে এবং বিপুল পরিমাণ পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে দেশটির বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলো এখন এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপে শামিল হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে চলেছে অত্যাধুনিক ‘স্টেলারটর’ (Stellarator) প্রযুক্তি।

কীভাবে কাজ করে ফিউশন প্রযুক্তি?

সূর্যের অভ্যন্তরে যে পদ্ধতিতে অবিরাম শক্তি উৎপন্ন হয়, তাকেই বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন। এই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে হাইড্রোজেনের মতো হালকা পরমাণুগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন ভারী পরমাণু তৈরি করে। ফলস্বরূপ বিপুল পরিমাণে শক্তি নির্গত হয়। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে পরীক্ষাগারে এই একই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে অফুরন্ত শক্তি উৎপাদনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে ফিউশন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘প্লাজমা’ নিয়ন্ত্রণ করা। ফিউশন ঘটাতে গেলে প্লাজমাকে কোটি কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করতে হয়। এত বেশি উষ্ণ কোনো পদার্থকে স্বাভাবিকভাবে কোনো যন্ত্রের দেওয়ালের সংস্পর্শে রাখা সম্ভব নয়। তাই শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে এই উত্তপ্ত প্লাজমাকে শূন্যে ভাসিয়ে রেখে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

‘স্টেলারটর’ প্রযুক্তির কেরামতি

জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা ফিজিক্সের গবেষক ও বিজ্ঞানীরা স্টেলারটর নামক বিশেষ ধরনের ফিউশন মেশিন নিয়ে কাজ করছেন। এতে একাধিক শক্তিশালী চৌম্বকীয় কয়েল ব্যবহার করা হয়, যা এমন এক শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে যার মাধ্যমে অতি উত্তপ্ত প্লাজমাকে মেশিনের মাঝখানে আটকে রাখা যায়। জার্মানির ‘ওয়েন্ডেলস্টেইন ৭-এক্স’ (Wendelstein 7-X) মেশিন ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তিতে বড় সাফল্য দেখিয়েছে। গত বছর এই মেশিনে প্লাজমার তাপমাত্রা প্রায় ৩ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল এবং সফলভাবে প্লাজমা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল।

প্রথমে ‘Alpha’, তারপর ‘Stellaris’ মেগা প্ল্যান্ট

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের প্রথম গবেষণা স্পিন-অফ হিসেবে তৈরি জার্মান সংস্থা ‘প্রোক্সিমা ফিউশন’ (Proxima Fusion) এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে ময়দানে নেমেছে। তাদের প্রথম বড় প্রকল্পের নাম রাখা হয়েছে ‘Alpha’। মিউনিখের কাছে গার্চিংয়ে এই প্রদর্শনী প্ল্যান্ট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যার লক্ষ্য ফিউশন ঘটিয়ে ব্যবহৃত শক্তির তুলনায় বেশি শক্তি বা নেট এনার্জি গেইন অর্জন করা।

এর পরবর্তী ধাপে ‘Stellaris’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ ফিউশন পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বাভারিয়ার গুন্ড্রেমিঙ্গেনের একটি পুরনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গাকে এই প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। ফিউশন থেকে উৎপন্ন এই শক্তিকে পরবর্তীতে সফলভাবে বিদ্যুতে রূপান্তর করে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করাই মূল লক্ষ্য।

ফিউশন গবেষণায় জলের মতো অর্থ বিনিয়োগ

এই উচ্চাভিলাষী প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে জার্মান সরকারও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। ফিউশন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ইউরো খরচ করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও বাণিজ্যিকভাবে এই পদ্ধতি থেকে নিয়মিত বিদ্যুৎ পেতে এখনও বেশ কিছু প্রযুক্তিগত বাধা পেরোতে হবে—যেমন প্লাজমাকে দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রাখা এবং যন্ত্রকে চরম তাপমাত্রা থেকে রক্ষা করা।

বিজ্ঞানীরা যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে পার করতে পারেন, তবে অদূর ভবিষ্যতে ফিউশন এনার্জিই হবে মানবসভ্যতার কম-কার্বনযুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য উৎস। পরীক্ষাগারের গণ্ডি পেরিয়ে জার্মানির এই উদ্যোগ মানবজাতিকে এক নতুন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *