“বিনা অপারেশনেই গায়েব হবে ক্যান্সার!”-শব্দতরঙ্গের যুগান্তকারী চিকিৎসায় নতুন মোড়

মানুষের শরীরের ভেতরের ছবি দেখতে আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার বহুদিনের। তবে এবার উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গকে কাজে লাগিয়ে শরীর না কেটে ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের এক নতুন পদ্ধতি নিয়ে হাজির হয়েছেন গবেষকরা। এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলী জেন জুয়ের কয়েক দশক আগের একটি ঘটনাচক্রে পাওয়া আবিষ্কার।
বিবিসি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শূকরের হৃদপিণ্ডের টিস্যুতে পরীক্ষা চালাতে গিয়ে জু এমন একটি পদ্ধতি খুঁজে পান, যা পরবর্তীতে ‘হিস্টোট্রিপসি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই শতকের প্রথম দশকে পিএইচডি শিক্ষার্থী হিসেবে জু অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগাক্রান্ত টিস্যু ধ্বংস ও সরিয়ে ফেলার উপায় খুঁজছিলেন। এ জন্য তিনি উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ দিয়ে টিস্যু যান্ত্রিকভাবে ভেঙে ফেলার ধারণা নিয়ে শূকরের হৃদপিণ্ডে পরীক্ষা চালান। জেনের শক্তিশালী অ্যামপ্লিফায়ারের শব্দে গবেষণাগারের অন্য গবেষকরা বিরক্ত হতে শুরু করলে, তিনি প্রতি সেকেন্ডে আলট্রাসাউন্ডের পালসের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। এতে প্রতিটি পালসের দৈর্ঘ্য মাইক্রোসেকেন্ডে নেমে আসে এবং শব্দ মানুষের শ্রবণসীমার বাইরে চলে যায়। কিন্তু এর ফল হয় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগের এক মিনিটের মধ্যেই শূকরের হৃদপিণ্ডের টিস্যুতে একটি গর্ত তৈরি হতে দেখেন তিনি।
আজ ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলের অধ্যাপক জুয়ের সেই ঘটনাচক্রে পাওয়া আবিষ্কারই হিস্টোট্রিপসির ভিত্তি। ২০২৩ সালের অক্টোবরের যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন যকৃতের চিকিৎসায় এর অনুমোদন দেয়। চলতি বছরের জুনে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যও জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় এই চিকিৎসা চালু করেছে। ক্যান্সারের চিকিৎসায় এই পদ্ধতিতে একটি টিউমারের ছোট নির্দিষ্ট অংশে শব্দতরঙ্গ কেন্দ্রীভূত করা হয়। রোবোটিক বাহু টিউমারের ওপর দিয়ে যন্ত্রটি পরিচালনা করে সঠিক জায়গায় তরঙ্গ পাঠায়। খুব দ্রুত ছোট ছোট পালস আকারে আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগের ফলে অতি ক্ষুদ্র ‘মাইক্রোবাবল’ তৈরি হয়, যা বারবার ফুলে ও চুপসে গিয়ে টিউমারের টিস্যু ভেঙে ফেলে। পরে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই অবশিষ্ট অংশ পরিষ্কার করে ফেলে।
তবে হিস্টোট্রিপসিকে এখনো সব ক্যান্সারের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। চিকিৎসার পর ক্যান্সার আবার ফিরে আসার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি শক্ত তথ্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়া শরীরের সব জায়গায় বা ফুসফুসের মতো গ্যাসপূর্ণ অঙ্গে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় না। তারপরও কিডনি ও অগ্ন্যাশয়ের টিউমারের চিকিৎসায় হিস্টোট্রিপসির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। লক্ষ্য হলো অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও বিকিরণ চিকিৎসার মতো কার্যকর হলেও কঠিন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত পদ্ধতির একটি নিরাপদ বিকল্প তৈরি করা।