অনলাইন প্রেমে ধোঁকা খেতে খেতে ক্লান্ত? এবার বাস্তবের ‘খাঁটি’ সম্পর্কে ফেরার জাদুকরী উপায়

বর্তমান ডিজিটাল দুনিয়ায় জীবনসঙ্গী বা মনের মানুষ খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে অনলাইন ডেটিং অ্যাপ। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে এই অ্যাপগুলো এখন ভুয়া প্রোফাইল, ‘ক্যাটফিশিং’ (মিথ্যা পরিচয় ও ছবি দিয়ে প্রেমের ফাঁদ) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর কারসাজিতে এক বিপজ্জনক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। স্ক্রিনের ওপারে থাকা মানুষটি আদেও সত্যি নাকি কোনো প্রতারক—তা বোঝা এখন বড় দায়!

ডিজিটাল দুনিয়ার এই জালিয়াতি ও প্রতারণা ঠেকাতে এবং মানুষকে আবার অনলাইনের গোলকধাঁধা থেকে বাস্তব পৃথিবীর খাঁটি সম্পর্কের দিকে ফিরিয়ে আনতে বাজারে এসেছে বেশ কিছু অভিনব ডেটিং স্টার্টআপ।

‘গিক মিট ক্লাব’: অদ্ভুত স্বভাবের মানুষদের জন্য খাঁটি ঠিকানা

যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরের দক্ষিণে অবস্থিত ক্রয়ডন এলাকার এক সেলুন মালিক ডেনি স্মিথ। তিনি প্রথাগত ডেটিং অ্যাপগুলোর ভিড়ে এক সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী আইডিয়া নিয়ে এসেছেন। ‘অদ্ভুত স্বভাবের বা ইতিহাসপ্রেমী মানুষদের বড় বাজারকে’ লক্ষ্য করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘গিক মিট ক্লাব’।

ডেনি স্মিথের মতে, বেশিরভাগ ডেটিং সাইটই কেবল মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে ছোটে, যেখানে প্রোফাইল যাচাইয়ের বালাই থাকে না। কিন্তু ‘গিক মিট ক্লাব’-এ আবেদনকারী প্রত্যেকটি প্রোফাইল স্মিথ নিজেই ম্যানুয়ালি যাচাই-বাছাই করেন। তিনি হাসতে হাসতে বলেন,

“আমি ভুয়া প্রোফাইল চট করে ধরে ফেলতে পারি। একবার একজন আবেদনকারী যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ছবি দিয়ে প্রোফাইল খুলেছিলেন!”

নিজের ক্লাবের ৩,৩০০ জন সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি প্রতি মাসে প্রায় ৫০টি সন্দেহভাজন আবেদন বাতিল করেন। এই ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য হলো—ভার্চুয়াল প্রেম বাদ দিয়ে মানুষকে যত দ্রুত সম্ভব বাস্তব পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। এই জন্য তারা প্রতি মাসে কুইজ প্রতিযোগিতা, কফি মিট-আপ এবং কমিক কনভেনশনের মতো জমকালো ছদ্মবেশী (Cosplay) অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, যাতে সমমনা মানুষ সামনাসামনি দেখা করে একে অপরকে চিনতে পারে।

‘চেরি ডেটিং’: ব্যাংক জালিয়াতি রোখার প্রযুক্তিতে এবার প্রেম পরীক্ষা!

ডেটিং অ্যাপের ভুয়া প্রোফাইল দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন লন্ডনের একজন ব্যাংকার জো মেসন। তিনি বলেন,

“আজকাল ডেটিং অ্যাপে কারও প্রোফাইল দেখলে নিজেকেই প্রাইভেট ডিটেকটিভের মতো গবেষণা করতে হয়। কিছু মানুষ কেবল কাল্পনিক প্রেম করতে চান, বাস্তবে দেখা করার কোনো উদ্দেশ্যই তাদের থাকে না।”

এই হতাশা দূর করতে মেসন নিয়ে এসেছেন ‘চেরি ডেটিং’। এখানে জালিয়াতি ঠেকাতে বড় বড় ব্যাংকের নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। অ্যাপটির বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহারকারীর তাৎক্ষণিক সেলফির সঙ্গে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বা পাসপোর্টের ছবি মিলিয়ে দেখে। ফলে প্রতিটি সদস্য যে আসল ও নির্ভরযোগ্য, তা ১০০% নিশ্চিত হওয়া যায়।

এছাড়াও, ব্যবহারকারীদের মানসিক মিল বা সামঞ্জস্যতা বোঝার জন্য এই অ্যাপটি কিছু প্রশ্ন করে একটি ‘সামঞ্জস্য স্কোর’ দেয়। মেসন বলেন, “কারও সঙ্গে যদি আপনার ৮০ শতাংশ মিল থাকে তবে সেটা দারুণ। যার সঙ্গে মাত্র ৫ শতাংশ মিল, তার পেছনে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট হবে কেন?”

AI-এর কারসাজি বনাম বাস্তব দুনিয়ার রোমাঞ্চ

এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের ৪৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন কোনো ডেটিং অ্যাপই তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, ৫৪ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছেন যে তারা নিজেদের অনলাইন প্রোফাইলকে চটকদার ও আকর্ষণীয় করে তুলতে চ্যাটজিপিটি বা কোপাইলটের মতো AI-এর সাহায্য নিচ্ছেন!

টেক্সাসের বিখ্যাত ডেটিং কোচ ও ‘ডেটিং ক্লাসরুম’-এর প্রতিষ্ঠাতা জোসেলিন পেঙ্কু অবশ্য মনে করেন, যারা লিখতে পারেন না তাদের জন্য এআই উপকারী, তবে ভুল নির্দেশনা দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন—আপনি যদি সিরিয়াস সম্পর্ক ও সংসার করতে চান, তবে এআই-কে সেই স্পষ্ট প্রম্পট দিন।

তবে পেঙ্কুর মূল মন্ত্র একটাই—সম্পর্ককে যত দ্রুত সম্ভব স্ক্রিনের বাইরে নিয়ে আসুন। এই ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে সম্প্রতি তিনি তার একদল ক্লায়েন্টকে নিয়ে পর্তুগালের আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে অবস্থিত ‘আজোরেস দ্বীপে’ ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তিমি দেখার রোমাঞ্চকর পরিবেশের পাশাপাশি, কোলাহলমুক্ত সেই দ্বীপটিতে ডিজিটাল স্ক্রিনের বাইরে গিয়ে নিজেদের জন্য সঠিক সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তারা।

প্রযুক্তির ছোঁয়া অবশ্যই থাকবে, তবে মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার আসল পরীক্ষা কিন্তু বাস্তব জগতেই হয়। তাই ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করলেও অন্ধ বিশ্বাস না করে সচেতন থাকুন, এবং চ্যাট বক্সের বাইরে এসে সামনাসামনি এক কাপ কফি খাওয়ার মাধ্যমেই শুরু হোক আপনার খাঁটি সম্পর্কের গল্প!