বিশেষ: উড়ন্ত রোবট তৈরি করবে ভবিষ্যতের শহর?-জেনেনিন কি বলছে প্রযুক্তিবিদেরা?

কল্পনা করা যেতে পারে এমন এক দৃশ্যের, যেখানে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখা যাচ্ছে ড্রোন কেবল প্যাকেজ পৌঁছে দিচ্ছে না, বরং মাঝ আকাশেই উড়ে উড়ে পুরো একটি ভবন নির্মাণ করছে। একসময় যা কেবল সায়েন্স ফিকশন সিনেমার দৃশ্য মনে হতো, আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে সে কল্পনা এখন বাস্তবতার অনেক কাছাকাছি। যুক্তরাজ্যের ‘ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন’ ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিস্টল’-এর গবেষকরা এমন একটি প্রকল্পে কাজ করছেন, যেখানে বিভিন্ন ড্রোনকে ব্যবহার করা হচ্ছে আকাশে ওড়ার সময়ই নির্মাণ কাজ সম্পাদনের জন্য।

এরিয়াল এএম: আকাশে থ্রিডি প্রিন্টিং

এই গবেষণা ‘এরিয়াল অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং’ বা ‘এরিয়াল এএম’ নামে এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উপর আলোকপাত করেছে। এটি এমন এক নতুন ধারণা, যেখানে বিভিন্ন ড্রোন বা ‘এরিয়াল রোবট’ উড়ন্ত অবস্থাতেই নির্মাণ উপাদান জমা করে ধাপে ধাপে কোনো কাঠামো তৈরি করে। ঠিক যেভাবে থ্রিডি প্রিন্টারে স্তরের পর স্তর বসিয়ে কাঠামো তৈরি হয়, এই পদ্ধতিও ঠিক তেমনই, তবে সেটি করা হবে আকাশে, ড্রোন ব্যবহার করে। বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ড্রোনগুলো নিজেরাই নির্মাণ উপাদান বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর মতো জটিল কাজ করতে পারে, ঠিক যেমনটি মানুষ কোনো ভবন তৈরির সময় করে।

সুবিধা ও সম্ভাবনা:

এই ধরনের ‘এরিয়াল রোবট’ নির্মাণ শিল্পের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে, বিশেষ করে এমন জায়গায় কাজ করে যেখানে মানুষের পৌঁছানো কঠিন বা বিপজ্জনক। এরা অনেক উঁচুতে, রুক্ষ ভূখণ্ডে বা এমন জায়গায় নির্মাণ কাজ করতে পারে, যে জায়গা মানব শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ নয়। গবেষকরা বলছেন, এই পদ্ধতি বর্তমানে বিশ্বের বড় আকারের নানামুখী সমস্যার সমাধান করতে সহায়তা করতে পারে, যেমন সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনের ঘাটতি মেটানো এবং আরও উন্নত অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন মেটানো। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের নির্মাণশিল্পে একটি টেকসই ও উদ্ভাবনী সমাধান হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া, এরা পরিবেশে বর্জ্য ও শক্তির ব্যবহার কমিয়ে আনতেও সহায়তা করতে পারে, যা ভবন নির্মাণকে করে তুলবে আরও পরিবেশবান্ধব।

গবেষণার অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ:

এই যুগান্তকারী গবেষণাটি সম্প্রতি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স রোবোটিক্স’-এ প্রকাশ পেয়েছে। এতে গবেষকরা একটি নতুন সিস্টেম উপস্থাপন করেছেন, যা একাধিক ‘এরিয়াল রোবট’কে নিরাপদ ও নির্ভুলভাবে একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে সাহায্য করবে। গবেষণায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে কাজ করেছেন গবেষকরা। যেমন– কীভাবে একাধিক ড্রোনের ওড়ার পথ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, বিভিন্ন উপাদান নির্দিষ্ট জায়গায় সঠিকভাবে বসানো যায় এবং কীভাবে এই পদ্ধতিকে বড় নির্মাণ প্রকল্পের জন্য বড় পরিসরে ব্যবহার করা যায় এমন সব বিষয়।

ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিস্টল-এর ড. বাসারান বাহাদির কোসার বলেছেন, এই ‘এরিয়াল’ নির্মাণ প্রযুক্তি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এরইমধ্যে অনেক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি। তবে এই পদ্ধতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এসব ড্রোন যে ধরনের উপাদান ব্যবহার করবে তা বাস্তব বিশ্বের কাঠামোর জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী ও টেকসই কি না তা নিশ্চিত করা। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এমন পরিবেশে চলাচল ও কাজ করা যেখানে জিপিএস সিগনাল হয়তো পুরোপুরি স্পষ্ট নয় এবং একাধিক ড্রোনকে একসঙ্গে মসৃণভাবে কাজ করানো।

প্রাথমিক প্রদর্শন ও পরীক্ষা:

গবেষকরা বলছেন, এসব বাধার পরও ‘এরিয়াল এএম’-এর প্রাথমিক বিভিন্ন প্রদর্শন খুবই কার্যকর ছিল। যেমন– ক্ষতিগ্রস্ত কাঠামো দ্রুত সারাতে ও মডিউলার বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে করতে পেরেছে এটি। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে, ভবিষ্যতে নির্মাণ শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে এই প্রযুক্তি। এই ধারণাগুলোকে ল্যাবের বাইরে পরীক্ষা করতে গবেষকরা জার্মানির ইএমপিএ (EMPA – Swiss Federal Laboratories for Materials Science and Technology)-তে অবস্থিত একটি বিশেষ জায়গা ব্যবহার করছেন, যার নাম ‘ড্রোনহাব’ (DroneHub)। ‘ড্রোনহাব’ বিজ্ঞানীদের এমন এক সুযোগ দিয়েছে যাতে তারা দেখতে পারেন বাস্তব দুনিয়ার পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উড়ুক্কু নির্মাণ যন্ত্র কতটা কার্যকরভাবে কাজ করে।

যদিও এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বাকি রয়েছে, তবে ‘এরিয়াল অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং’ প্রযুক্তি নির্মাণ শিল্পের ভবিষ্যৎকে আমূল পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে এবং আকাশ থেকে ভবন তৈরির দিনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।