টাইম ম্যাগাজিনের তালিকায় বাদ পড়া ৭ প্রযুক্তি টাইকুন, জেনেনিন তাদের নাম

টাইম ম্যাগাজিনের বার্ষিক প্রভাবশালী ১০০ জনের তালিকা বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। এবারের তালিকাও তার ব্যতিক্রম নয়। উন্নয়ন কর্মী থেকে সরকারপ্রধানের পরিচিতি পাওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যেমন এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন, তেমনই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও মহাকাশ অভিযানের স্বপ্নদ্রষ্টা ইলন মাস্কও মার্কিন প্রেসিডেন্টের ডান হাত হিসেবে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। তবে, এই দুজনের চিরাচরিত পরিচয়ের বাইরে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাদের অন্তর্ভুক্তি নজর কেড়েছে।

তবে, তালিকার অন্তর্ভূক্তির পাশাপাশি, প্রযুক্তি জগতের বেশ কিছু পরিচিত মুখ এবার বাদ পড়েছেন, যা কম কৌতুহল উদ্দীপক নয়। আসুন, এবারের তালিকায় অনুপস্থিত সেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিকে একবার চোখ বুলানো যাক:

জেনসেন হুয়াং: এনভিডিয়ার স্বল্পভাষী প্রধান নির্বাহী ২০২৪ সালের টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। সে বছর বাজার মূল্যে এনভিডিয়ার অভাবনীয় উত্থান তাকে এই স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। যদিও এ বছর এনভিডিয়ার শেয়ার বাজারে উত্থানের গতি কিছুটা কমেছে, কোম্পানির গুরুত্ব কিন্তু আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আন্তর্জাতিক দৌড়ে এনভিডিয়া এখন অন্যতম নিয়ন্ত্রক। চীন-মার্কিন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় কোম্পানিটি এবং এর উদ্ভাবন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বাজার মূল্যে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের ক্লাবেও প্রবেশ করেছে এনভিডিয়া। এত কিছুর পরেও জেনসেন হুয়াংয়ের এবারের তালিকায় না থাকা কিছুটা বিস্ময়কর।

বিল গেটস: টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী তালিকায় বিরল হ্যাটট্রিকের মালিক বিল গেটস। ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত এই তালিকায় ছিলেন। এরপর ২০২০-২১ সালে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে, মিলেনিয়াম লিস্টে বিশ্বের এক সময়ের এই শীর্ষ ধনীকে আর দেখা যায়নি।

গুগল জুটি (ল্যারি পেইজ ও সার্গেই ব্রিন): আধুনিক জীবনযাত্রায় গুগলের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। এই গুগলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেইজ এবং সার্গেই ব্রিন বিল গেটসের মতোই তিনবার টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তাদের অন্তর্ভুক্তির বছরগুলো ছিল ২০০৯, ২০১৪ এবং ২০২৩। তবে, এবার এই প্রভাবশালী জুটিকেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

ল্যারি এলিসন: ওরাকলের এই প্রতিষ্ঠাতা গত বছর টাইম ম্যাগাজিনের তালিকায় ছিলেন। ডেটাবেইজ প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটানো ওরাকলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রযুক্তি বিশ্বে দীর্ঘকাল ধরেই এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। সফটওয়্যার শিল্পের অন্যতম এই বৃহৎ কোম্পানির নেতৃত্ব উদ্ভাবনী ডেটাবেইজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে এন্টারপ্রাইজ সেবা প্রদানের মাধ্যমে বাণিজ্য জগতের চেহারা পাল্টে দিয়েছে। এমনকি এ বছর টিকটক কেনার দৌড়েও তিনি ছিলেন। এত কিছুর পরেও তার অনুপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ।

টিম কুক: অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুকের এবারের তালিকায় না থাকা অপ্রত্যাশিত ছিল না। গত দুই বছর ধরে আইফোন তেমন কোনো নতুনত্ব আনতে পারেনি। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানি হওয়া সত্ত্বেও এবং তর্কসাপেক্ষে বিশ্বের সেরা ফোন তৈরি করা সত্ত্বেও অ্যাপল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো আকাঙ্ক্ষিত প্রযুক্তি আনতে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। এর প্রভাব শেয়ার বাজারেও দেখা গেছে। যদিও অ্যাপল মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের একমাত্র তিন ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি, যার কৃতিত্ব টিম কুকেরই প্রাপ্য। অ্যাপলের এই স্বল্পভাষী অপারেশনাল মাস্টারমাইন্ড নির্বাহী ২০১২ সালে সিইও হওয়ার পরপরই এবং এরপর ২০২১ সালে টাইম ম্যাগাজিনের তালিকায় উঠে এসেছিলেন।

জেফ বেজোস: গত কয়েক বছরে অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের পরিচয় প্রযুক্তিপ্রেমীদের বাইরেও বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। অ্যামাজনের সিইও থেকে তিনি বিশ্বের শীর্ষ ধনী এবং বর্তমানে মহাকাশ ভ্রমণ সংস্থা ব্লু অরিজিনের জন্য বেশি পরিচিত। সম্প্রতি ছয় নারীর মহাকাশ অভিযান তার কোম্পানিকে শিরোনামে এনেছে। মহাকাশ অভিযানে তার পরিকল্পনা ইলন মাস্কের থেকে ভিন্ন। মাস্ক যেখানে অন্য গ্রহে মানুষ পাঠাতে চান, বেজোস সেখানে বায়ুমণ্ডলের শেষ প্রান্তে পর্যটকদের পাঠাতে চান। এর পাশাপাশি নাসার সঙ্গেও কাজ করছে তার কোম্পানি। বেজোস ২০১৮ সালে টাইম ম্যাগাজিনের তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন।

স্যাম অল্টম্যান: ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান পরপর দুই বছর টাইম ম্যাগাজিনের তালিকায় ছিলেন। তবে এরপর থেকেই তার কোম্পানির উপর যেন শনির দৃষ্টি পড়েছে। তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন ইলন মাস্ক, যিনি ক্রমাগত ওপেনএআই-এর উন্নয়নে বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ। এরই মধ্যে চীন থেকে উঠে এসেছে ডিপসিক, যা ওপেনএআই-এর শেয়ার মূল্যে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ইলন মাস্কের সঙ্গে তার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী অল্টম্যান সম্ভবত সেই মামলায় জিতবেন। যদি তা ঘটে, তাহলে ওপেনএআই-এর বাণিজ্যিক কোম্পানিতে রূপান্তরে আর কোনো বাধা থাকবে না। দ্রুততম সময়ে বোর্ডরুম বিদ্রোহ সামলে ফের কোম্পানির চালকের আসনে বসা অল্টম্যান সম্ভবত এই ঝড়ও সামাল দেবেন বলে আশা করা যায়। তবে, আপাতত তিনি টাইম ম্যাগাজিনের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

এই প্রভাবশালী প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বদের অনুপস্থিতি এবারের টাইম ম্যাগাজিনের তালিকাটিকে আরও বেশি কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে। প্রযুক্তি জগতের এই উত্থান-পতন এবং নতুন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের আগমন আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।