অ্যাপল কেন চীনের বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না? আইফোন উৎপাদনে ভরসা সেই চীনই

আইফোনের সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালালেও, চীনের বিকল্প হিসেবে এখনও পর্যন্ত কোনো উপযুক্ত দেশ খুঁজে পায়নি টেক জায়ান্ট অ্যাপল। উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীনের বিশাল ও দক্ষ জনশক্তি, সুসংগঠিত অত্যাধুনিক অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অ্যাপলকে দেশটির ওপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে, সম্প্রতি কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য, বিশেষ করে স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের ওপর নতুন করে আরোপিত শুল্ক অব্যাহতি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশনের এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, এসব পণ্য ট্রাম্পের পূর্বঘোষিত বৈশ্বিক ১০ শতাংশ এবং চীনের ওপর আরোপিত ১২৫ শতাংশ শুল্ক থেকে মুক্ত থাকবে। এই শুল্ক ছাড়ের ফলে অ্যাপলের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমলেও, দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি কমাতে চীনের বিকল্প খোঁজার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাচ্ছে।

যে কারণে চীনের ওপর নির্ভরশীল অ্যাপল:

অতুলনীয় উৎপাদন ব্যবস্থা: চীনের শিল্প পরিকাঠামো বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক উন্নত। শেনজেন ও ঝেংঝোর মতো শহরগুলোতে বিশাল আকারের কারখানা (যেমন ফক্সকনের ‘আইফোন সিটি’) বিদ্যমান, যেখানে প্রতি বছর শত শত মিলিয়ন ডিভাইস উৎপাদন করা সম্ভব। এই উৎপাদন ব্যবস্থায় হাজার হাজার বিশেষায়িত সরবরাহকারী রয়েছে, যারা ডিসপ্লে, ব্যাটারি, সেন্সরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে এবং এরা একে অপরের কাছাকাছি অবস্থিত। আইফোন লঞ্চের সময় দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীনের বিশাল দক্ষ শ্রমিক এবং সুসংগঠিত লজিস্টিক নেটওয়ার্কের কোনো বিকল্প নেই।

খরচের দক্ষতা: যদিও চীনে শ্রমিকদের মজুরি আগের তুলনায় বেড়েছে (২০২৪ সালে ঘণ্টায় গড়ে ৫-১০ ডলার, যা এক দশক আগে ছিল ১-২ ডলার), তবুও ভারত, ভিয়েতনাম বা মেক্সিকোর তুলনায় সামগ্রিক উৎপাদন খরচ এখনও কম। এর প্রধান কারণ হলো, চীনে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনে খরচ কম হয় এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে সরবরাহকারীদের সঙ্গে অ্যাপলের ভালো বোঝাপড়া রয়েছে। পাশাপাশি, চীনা সরকার বিভিন্ন ধরনের কর ছাড় ও সস্তা জমির মতো সুবিধা প্রদান করে থাকে। অন্যদিকে, ভারতে কারখানা স্থাপন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়মিততা এবং দুর্বল পরিবহন অবকাঠামোর কারণে খরচ আরও বেড়ে যায়।

গভীরভাবে সংযুক্ত সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক: অ্যাপলের সরবরাহ চেইনে প্রায় ২০০টিরও বেশি প্রধান সরবরাহকারী রয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক (যেমন বিওই টেকনোলজি, লাক্সশেয়ার প্রিসিশন) চীনে অবস্থিত। এই সরবরাহকারীরা একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত, যা ছোট স্ক্রু থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক চিপ পর্যন্ত সবকিছু সরবরাহ করে। এই জটিল নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়লে অ্যাপলের ডিভাইস উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং নতুন করে এমন একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বহু বছর সময় লাগতে পারে। এমনকি অ্যাপল কিছু উৎপাদন ইউনিট অন্য দেশে সরিয়ে নিলেও, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ (যেমন বিওই-এর ওএলইডি ডিসপ্লে বা চীনে প্যাকেজ করা টিএসএমসি চিপ) এখনও চীন থেকেই আসে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে চীনের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে বেঁধে রাখে।

বিশেষায়িত দক্ষতা: দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে চীনের শ্রমিকরা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পণ্য উৎপাদনে পারদর্শী, যা অ্যাপলের জটিল ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরির জন্য অপরিহার্য। এই দক্ষতা তাদের দ্রুত সমস্যা সমাধানে এবং কম ত্রুটিযুক্ত পণ্য উৎপাদনে সাহায্য করে। ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশে উৎপাদন দক্ষতা কিছুটা উন্নত হলেও, এখনও চীনের ধারেকাছেও নেই। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালে কম অভিজ্ঞ শ্রমিকদের কারণে আইফোনের প্রাথমিক সংযোজনে ত্রুটির সংখ্যা বেশি ছিল, যদিও বর্তমানে সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্য: মার্কিন-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা, শুল্ক এবং কোভিড-১৯ জনিত লকডাউনের কারণে অ্যাপল তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে চাইছে। তবে চীন থেকে দ্রুত সরে গেলে দেশটির সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে, যা অ্যাপলের বিশাল বাজার (২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বিক্রয়ের প্রায় ২০ শতাংশ বা ৭০ বিলিয়ন ডলার) ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই অ্যাপলের বর্তমান কৌশল হলো ধীরে ধীরে অন্যান্য দেশে উৎপাদন সম্প্রসারণ করা। ভারত বর্তমানে আইফোনের ১০-১৫ শতাংশ উৎপাদন করে এবং ফক্সকন ও উইস্ট্রনের মতো সংস্থা তামিলনাড়ুতে কারখানা চালাচ্ছে। ভিয়েতনামে এয়ারপড ও কিছু ম্যাকবুক তৈরি হয়, এবং থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় ছোট ছোট যন্ত্রাংশ উৎপাদিত হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত আইফোন উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই চীনে নিয়ন্ত্রিত হয়।

সময় ও বিনিয়োগের বাধা: চীনের মতো বিশাল উৎপাদন পরিকাঠামো অন্য কোনো দেশে তৈরি করতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, ফক্সকন ২০১৭ সাল থেকে ভারতে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার ফলে আইফোন উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তবে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় সরবরাহকারীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অন্যদিকে, অ্যাপলের ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ উৎপাদন মডেল, যেখানে প্রয়োজনীয় উপকরণ ঠিক সেই সময়েই সরবরাহ করা হয় যখন সেগুলি প্রয়োজন, তা চীনের উন্নত অবকাঠামো এবং সুসংগঠিত সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অন্য কোনো দেশে এই মডেল কার্যকর করতে গেলে বিলম্ব এবং গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে।

টিম কুকের ভাবনা:

অ্যাপলের সিইও টিম কুক বারবার চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টার কথা বলেছেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি চীনের উৎপাদন ব্যবস্থার দক্ষতা, বিপুল সংখ্যক কর্মীর সক্ষমতা এবং অত্যাধুনিক সরঞ্জাম তৈরির ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন। তিনি মনে করেন, চীনের মতো নির্ভুলতা এবং পেশাদারিত্ব অন্য কোথাও সহজে পাওয়া যায় না। কুকের মতে, সরবরাহ চেইন সরানো একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া এবং রাতারাতি এটি সম্ভব নয়। অ্যাপল ধীরে ধীরে ভারত, ভিয়েতনাম ও এশিয়ার অন্যান্য অংশে উৎপাদন সম্প্রসারণ করছে, তবে এটি চীন ছেড়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নয়, বরং স্থিতিশীলতা ও নমনীয়তা তৈরির একটি প্রচেষ্টা।

বৈচিত্র্যের বর্তমান চিত্র:

২০২৪ সাল পর্যন্ত অ্যাপল চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে এর গতি বেশ ধীর। ভারতে আইফোন ১৪ এবং আইফোন ১৫ মডেলের ১০-১৫ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে এবং ফক্সকন, উইস্ট্রন ও পেগাট্রনের মতো সংস্থা সেখানে কারখানা পরিচালনা করছে। ভিয়েতনাম এয়ারপড, অ্যাপল ওয়াচ ও কিছু ম্যাকবুক সংযোজন করছে এবং গোয়েরটেক ও লাক্সশেয়ারের মতো সরবরাহকারীরা সেখানে তাদের কার্যক্রম বাড়িয়েছে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশ অ্যাপলের জন্য ছোট ছোট যন্ত্রাংশ তৈরি করছে এবং মেক্সিকোতে অ্যাসেম্বলিংয়ের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে এই সমস্ত পদক্ষেপ সত্ত্বেও, অ্যাপলের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র এখনও চীন। ভারতে সংযোজিত আইফোনগুলোতেও প্রায়শই চীন-নির্মিত যন্ত্রাংশ ব্যবহৃত হয় এবং উচ্চ-প্রযুক্তির আইফোন প্রো সিরিজের মতো মডেলগুলি মূলত চীনেই তৈরি হয়। কারণ এই মডেলগুলির উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো একক দেশ একইসঙ্গে বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা, দক্ষতা এবং গতির সমন্বয় ঘটাতে পারেনি। ভূ-রাজনৈতিক চাপ থাকলেও, চীনে অ্যাপলের দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা সরবরাহ চেইনের আধিপত্য আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত বজায় থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।