১০ কোটি শিশু পেলেও বঞ্চিত প্রায় ৪১%! পিএম পোষণ প্রকল্পের আসল সত্যিটা জেনে অবাক হবেন

২০০১ সাল। খরা ও অনাহার সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক মামলার শুনানি চলছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে। পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (PUCL)-এর দায়ের করা সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট একটি যুগান্তকারী নির্দেশ জারি করে— ৬ মাসের মধ্যে দেশের সমস্ত সরকারি ও সরকার পোষিত প্রাথমিক স্কুলে পড়ুয়াদের জন্য রান্না করা দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।

ক্ষুধা দূরীকরণের এক মানবিক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও, পরবর্তী দুই দশকে এটি কার্যত শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য ভারতের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

তামিলনাড়ুর সেই ঐতিহাসিক পরীক্ষা ও গবেষণার ফল

স্কুলে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার এই ধারণা অবশ্য নতুন ছিল না। ষাটের দশকের গোড়াতেই তামিলনাড়ুতে প্রথম এই মডেল চালু হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, স্কুলে পড়ুয়া ভর্তির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ছাত্রী এবং অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের প্রভাব ছিল অপরিসীম। প্রতিদিন নিশ্চিতভাবে একবেলা খাবার পাওয়ার সুযোগ অনেক পরিবারের কাছেই সন্তানকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে পাঠানোর মূল অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায়। ২০০১ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তামিলনাড়ুর সেই সফল মডেলই গোটা দেশের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়।

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরের বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণা পত্রেও দেখা গিয়েছে, এই প্রকল্পের ফলে প্রাথমিক স্তরে পড়ুয়া ড্রপআউট বা স্কুলছুটের হার ব্যাপকভাবে কমেছে এবং ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলিতে যেখানে শিশুর খাবার এবং শিক্ষার খরচের মধ্যে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চলে, সেখানে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার অভিভাবকদের জন্য বিশাল স্বস্তি নিয়ে আসে।

বর্তমানে কতটা বিস্তৃত ‘পিএম পোষণ’ প্রকল্প?

বর্তমানে মিড-ডে মিলের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে ‘পিএম পোষণ’ (PM POSHAN)। সর্বশেষ UDISE+ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১০.৯ লক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আনুমানিক ১০ কোটি ৩২ লক্ষ শিশু এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিদিন দুপুরের খাবার পায়।

২০২১ থেকে ২০২৬ সালের জন্য এই প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সরকারের মোট বাজেট বরাদ্দ ৫৪,০৬১ কোটি টাকা। বর্তমানে রান্নার খরচ বাবদ প্রতিজন প্রাথমিক পড়ুয়ার জন্য দৈনিক ৬.৭৮ টাকা এবং উচ্চ প্রাথমিকে ১০.১৭ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই সংখ্যা ছোট মনে হলেও, সার্বিকভাবে এটি বিশ্বের বৃহত্তম স্কুলভিত্তিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার রূপ নিয়েছে।

প্রকল্পের আওতার বাইরে এখনও বিপুল সংখ্যক শিশু

তবে এত বড় সাফল্যের আড়ালেও রয়েছে এক বিরাট শূন্যতা। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট নথিভুক্ত পড়ুয়াদের মাত্র ৪১.৮ শতাংশ এই প্রকল্পের সুবিধা পায়।

দেশের স্বীকৃত বেসরকারি অনুদানহীন স্কুলে পড়ে প্রায় ৯ কোটি ৫৮ লক্ষ শিশু, যা মোট পড়ুয়ার প্রায় ৩৯ শতাংশ। এই সমস্ত কম খরচের বেসরকারি স্কুলের শিশুরা সরকারি নীতি অনুযায়ী পিএম পোষণ প্রকল্পের আওতার বাইরে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কম খরচের প্রাইভেট স্কুলে পড়া অনেক শিশুর পরিবারের আর্থিক অবস্থাও সরকারি স্কুলের শিশুদের মতোই অসচ্ছল। ফলে এক বিপুল সংখ্যক শিশু এই পুষ্টিকর খাবারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

একটি দুপুরের খাবার কীভাবে বদলে দেয় ক্লাসরুমের পরিবেশ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাবারের প্রভাব শুধু ভর্তির পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়। খালি পেটে কোনো শিশুর পক্ষেই দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব নয়। শিক্ষক যত দক্ষই হোন না কেন, খিদে মিটে গেলেই কেবল শেখার আসল পরিবেশ তৈরি হয়।

এর পাশাপাশি রয়েছে এক অভূতপূর্ব সামাজিক ইতিবাচক প্রভাব। গবেষণায় প্রমাণিত, যখন বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সামাজিক স্তরের শিশুরা একই সঙ্গে এক সারিতে বসে খাবার খায়, তখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা বিভাজন ও বৈষম্যের প্রাচীর ভাঙতে শুরু করে। এক বেলার খাবার এভাবে একদিকে যেমন পেটের খিদে মেটাচ্ছে, তেমনই ভারতের শিক্ষার ভবিষ্যৎকেও নীরবে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *