কোলে সন্তান নিয়ে একা বাঙাল নারীর লড়াই, জেনেনিন বুড়িমার লড়াইয়ের কাহিনী

কালীপুজো মানেই আকাশে প্রদীপের আলোর রোশনাই আর মাটির মেজেতে বাজির শব্দ। আর এই উৎসবের মরসুমে বঙ্গবাসীর কাছে ‘বুড়িমা’ এক নস্ট্যালজিয়া। চড়কি, রংমশাল কিংবা ফুলঝুরি—এক সময় এই ব্র্যান্ডের বাজি ছাড়া বহু বাঙালির কালীপুজোই অসম্পূর্ণ মনে হত। প্যাকেট গায়ে থাকা সেই বৃদ্ধার ছবি আজও কোটি বাঙালির চেনা। কিন্তু প্রশ্ন হল, প্যাকেটের গায়ে আঁকা এই মুখ কি নিছকই কোনও কাল্পনিক চরিত্র? একেবারেই নয়। এর পেছনে রয়েছে রক্তমাংসের এক লড়াকু নারীর চরম সংগ্রামের ইতিহাস, যা হার মানাবে সিনেমার গল্পকেও।
দেশভাগের অন্ধকার ও শূন্য হাতে শুরু
বাংলার এই জনপ্রিয় বাজির ব্র্যান্ডের নেপথ্যে থাকা মানুষটির আসল নাম অন্নপূর্ণা দাস। তাঁর আদি বাড়ি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরে। দেশভাগের ভয়াবহ দাঙ্গা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে ১৯৪৮ সালে মাত্র দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে এপারে চলে আসতে বাধ্য হন তিনি। প্রথমে তাঁর আশ্রয় মেলে দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরের একটি শরণার্থী শিবিরে। অভাবের তাড়নায় সংসার চালাতে সেখানেই বিড়ি বাঁধার কাজ শিখে নেন অন্নপূর্ণা। সন্তানদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে এভাবেই শুরু হয় তাঁর প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই।
পুলিশের মার ও অদম্য জেদ
পরিবারে কিছুটা স্বচ্ছলতা আসার পর তিনি পাকাপাকিভাবে চলে আসেন বেলুড়ে। ১৯৫২ সালে সেখানে একটি ছোট দোকান কেনেন অন্নপূর্ণা। প্রথমে সেই দোকানে লজেন্স, খেলনা, পুজোর প্রতিমা এবং ঘুড়ির মতো নানা মরসুমি জিনিস বিক্রি করতেন। কিন্তু কালীপুজোর সময় তাঁর মাথায় আসে বাজি বিক্রির অভিনব এক ভাবনা। অন্যের থেকে টাকা ধার করে কিছু বাজি কিনে দোকান সাজান তিনি।
তবে সেই ব্যবসা শুরুর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। লাইসেন্স না থাকায় পুলিশ এসে তাঁর সেই সাধের বাজি বাজেয়াপ্ত করে এবং দোকানটিও ভেঙে দেয়। কিন্তু এই বিপর্যয় তাঁকে দমাতে পারেনি, বরং তাঁর জেদ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আইনি জটিলতা কাটাতে তিনি নিজেই খোঁজখবর শুরু করেন এবং নিয়ম মেনে বাজি বিক্রির লাইসেন্স থেকে শুরু করে বাজি তৈরির সরকারি অনুমতি জোগাড় করে নেন।
‘বুড়িমা’ ব্র্যান্ডের জন্ম ও আকাশছোঁয়া সাফল্য
আইনি অনুমতি পাওয়ার পর তিনি সোজা চলে যান বাঁকড়ার বিশিষ্ট কারিগর আকবর আলির কাছে। তাঁর কাছ থেকেই হাতেকলমে বাজি তৈরির সমস্ত কৌশল রপ্ত করেন অন্নপূর্ণা। প্রথম মরসুমেই তাঁর তৈরি সমস্ত বাজি চোখের পলকে বিক্রি হয়ে যায়। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে তাঁকে ‘বুড়িমা’ বলে ডাকা হতে শুরু করে, আর সেই নামেই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর ব্যবসার খ্যাতি।
ব্যবসার প্রসারের পেছনে ছিল তাঁর অসাধারণ বাজার বোঝার ক্ষমতা ও দূরদর্শিতা। প্রায়শই তিনি উত্তরপাড়া, সালকিয়া কিংবা বড়বাজারের অলিগলি ঘুরে বেড়াতেন। বাজারে ঠিক কোন ধরনের বাজির চাহিদা সবচেয়ে বেশি, তা খুঁটিয়ে নোট করতেন। দক্ষ বাজির কারিগরদের খুঁজে বের করে তাঁদের কাছ থেকে কাজ শিখে নিজেই বাজি তৈরির বিশাল পরিকাঠামো গড়ে তোলেন। তাঁর এই একনিষ্ঠ মেধার জোরেই হাওড়ার গণ্ডি পেরিয়ে ডানকুনি, তালবান্দা এমনকী অন্ধ্রপ্রদেশের শিবকাশীর মতো বড় অঞ্চলেও কারখানা গড়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে বদল ও আজকের ‘বুড়িমা’
পরিবেশ দূষণ রোধে একসময় আদালতের রায়ে শব্দবাজি নিষিদ্ধ হওয়ায় চকোলেট বোমের উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয় সংস্থাটি। যার জেরে ব্যবসার প্রাথমিক ধাক্কা লাগলেও, হাল ছাড়েননি উত্তরসূরিরা। পরবর্তীতে তারা সম্পূর্ণভাবে রংমশাল, চড়কি ও ফুলঝুরির মতো সবুজ বাজিতে জোর দেন। ১৯৯৫ সালের ৩ জুন অন্নপূর্ণা দাস চিরতরে বিদায় নিলেও রেখে যান তাঁর অমর সৃষ্টি। বর্তমানে তাঁর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম অত্যন্ত সফলভাবে এই ব্যবসার দায়িত্ব সামলাচ্ছে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ‘বুড়িমা’ শুধু একটি বাজির নাম নয়, এটি দেশভাগের শরণার্থী জীবন থেকে ঘুরে দাঁড়ানো এক নারীর অদম্য সংগ্রাম এবং বাঙালি নারীর সাহসিকতার এক ইতিহাস।