৯০৪ কোটির ব্যাঙ্কিং জালিয়াতি! সিবিআই-এর জালে ফিউচার গ্রুপের কর্ণধার কিশোর বিয়ানি, তোলপাড় করপোরেট দুনিয়ায়!

দেশে ব্যাঙ্কিং সেক্টরে ফের এক বিশাল জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (SBI)-কে ৯০৪.৩২ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের আর্থিক জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে ‘ফিউচার রিটেইল লিমিটেড’ (FRL), তার প্রমোটার ও ডিরেক্টর কিশোর লক্ষ্মীনারায়ণ বিয়ানি এবং রাকেশ গোপীকিশন বিয়ানির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)। এ ছাড়া এই মামলায় একাধিক অজ্ঞাতপরিচয় সরকারি কর্মচারী এবং অন্যান্য ব্যক্তির নামও জড়ানো হয়েছে।
এসবিআই-এর দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে সিবিআই ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ফৌজদারি ষড়যন্ত্র ও জালিয়াতির ধারার পাশাপাশি ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন’-এর কড়া ধারায় মামলা রুজু করেছে। এফআইআর দায়ের করার পরপরই সিবিআই-এর একাধিক তদন্তকারী দল মুম্বাইতে বিয়ানি ব্রাদার্স ও কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ঠিকানায় তল্লাশি অভিযান চালিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করেছে।
কীভাবে এবং কখন প্রকাশ্যে এল এই বিশাল জালিয়াতি?
বিডিও ইন্ডিয়া এলএলপি (BDO India LLP)-র মাধ্যমে করানো এক ফরেনসিক অডিট রিপোর্ট থেকে এই কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। এই অডিট রিপোর্টে ১ এপ্রিল ২০১৭ থেকে ৩০ এপ্রিল ২০২২ পর্যন্ত ফিউচার রিটেলের সমস্ত আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হয়েছিল।
তদন্তে দেখা যায়, এফআরএল-এর লোন অ্যাকাউন্টটি ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল থেকেই ‘নন-পারফর্মিং অ্যাসেট’ (NPA) হিসেবে চিহ্নিত ছিল। পরবর্তীতে চলতি বছরের ২৩ মার্চ এসবিআই-এর ‘ফ্রড আইডেন্টিফিকেশন কমিটি’ এই অ্যাকাউন্টটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ‘ফ্রড অ্যাকাউন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করে। ফরেনসিক অডিটরের রিপোর্টে এমন ১৩টি সম্পর্কিত সংস্থা বা এনটিটির (Entities) সন্ধান মেলে, যেগুলিকে পর্যালোচনা চলাকালীন ফিউচার রিটেইল মোট ৫,৮৭৮.২৮ কোটি টাকার নিট পেমেন্ট করেছে। এই সংস্থাগুলিকে মোট ২৪,০০২.০৯ কোটি টাকা দেওয়া হলেও, সেখান থেকে ফেরত এসেছে মাত্র ১৮,১২৩.৭৯ কোটি টাকা।
কীভাবে করা হয়েছিল অর্থের নয়ছয়?
অডিট রিপোর্টে আরও জানা গেছে যে, ৯টি এমন সম্পর্কিত সংস্থাকে ১,২৬৩.৬৮ কোটি টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছিল, যাদের নিজস্ব আর্থিক ক্ষমতা ও ঘোষিত আয় এত বিশাল অঙ্কের টাকার ধারেকাছেও ছিল না।
এর পাশাপাশি, গ্রুপের আরেক সংস্থা ‘সিনটেক্স ট্রেডিং অ্যান্ড এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সঙ্গে যুক্ত সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও সামনে এসেছে। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ফিউচার রিটেইল এই সিনটেক্স কোম্পানিকে ৬০৬.৬০ কোটি টাকার লোন দিয়েছিল। যার ফলে সিনটেক্সের শর্ট টার্ম লোন ও অ্যাডভান্স ২০১৯ সালের ৩১ মার্চে যেখানে ছিল মাত্র ৮.৩৭ কোটি টাকা, ২০২১ সালের ৩১ মার্চে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫০.১৪ কোটি টাকায়! অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ব্যবসা চালানোর বদলে এই ফান্ড ফিউচার রিটেইল থেকে সরিয়ে বেআইনিভাবে গ্রুপের অন্যান্য সংস্থাকে লোন দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিসেবের খাতায় মারাত্মক গোলমাল ও ভুয়া তথ্য
সিবিআই সূত্রের খবর, ফরেনসিক অডিটে ফিউচার রিটেলের অ্যাকাউন্টিং রেকর্ডেও বহু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে:
সিকিউরিটি ডিপোজিট জালিয়াতি: ২০১৯ অর্থবর্ষে যেখানে সিকিউরিটি ডিপোজিট ছিল ১,৯৩৮.৩৫ কোটি টাকা, ২০২০ অর্থবর্ষে তা এক লাফে বেড়ে হয় ৪,৪০৬.১৭ কোটি টাকা। অথচ তাজ্জবের বিষয় হলো, এই সময়কালের মধ্যে কোম্পানির স্টোরের সংখ্যা ১,৫১১টি থেকে কমে দাঁড়িয়েছিল ১,৩৫০টিতে!
সাপ্লায়ার অ্যাডভান্সে চরম কারচুপি: ২০১৭ অর্থবর্ষে যেখানে সাপ্লায়ারদের দেওয়া অ্যাডভান্সের পরিমাণ ছিল ৫৩০.২৮ কোটি টাকা, ২০২১ অর্থবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,০৮৯.২২ কোটি টাকায়। অন্যদিকে একই সময়ে কোম্পানির মোট কেনাকাটা ১৩,২১২.৯২ কোটি টাকা থেকে বিপুল পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩,৭৬৫.৩০ কোটি টাকায়।
স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার দেওয়া অভিযোগ ও সিবিআই-এর এই প্রাথমিক পদক্ষেপে স্পষ্ট যে, কাগুজে লেনদেনের জটিল জাল বুনে ব্যাঙ্ক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শত শত কোটি টাকা তছরুপ করা হয়েছে। বর্তমানে বাজেয়াপ্ত নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে সিবিআই অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং এই জালিয়াতির শিকড় কত দূর ছড়িয়ে রয়েছে, তা উদঘাটনে জোরকদমে তদন্ত চালাচ্ছে।