৭,০০০ কোটি টাকার বিশাল সাম্রাজ্য, তবুও বিশ্ববাজারে ভারতের বাজি শিল্প কেন পিছিয়ে? জেনে নিন নেপথ্যের আসল কারণ

ভারতে দীপাবলি বা দিওয়ালি উৎসব আসতেই দেশজুড়ে আতশবাজির চাহিদা তুঙ্গে ওঠে। বর্তমানে ভারতে বাজি শিল্পের মোট কারবারের পরিমাণ প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এত বিশাল দেশীয় বাজার থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে (Global Market) নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি ভারত। প্রতি বছর ভারত থেকে মাত্র ১০ লাখ ডলারের কম মূল্যের আতশবাজি বিদেশে রপ্তানি হয়। বৈশ্বিক বাজি রপ্তানির বাজারে ভারতের অংশীদারি মাত্র ০.০৪২ শতাংশ!
দেশের বাজির রাজধানী শিবকাশী: আয়ের ৮০% আসে ৩০ দিনে
তামিলনাড়ুর শিবকাশী (Sivakasi) শহরকে ভারতের বাজি উৎপাদনের মূল কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। দেশের মোট উৎপাদিত বাজির প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই তৈরি হয় এই একটি শহর থেকে। ‘তামিলনাড়ু ফায়ারওয়ার্কস অ্যান্ড অ্যামোর্সেস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (TANFAMA)-র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭,০০০ কোটি টাকার বাজি বাজারের মধ্যে সরাসরি কারখানা স্তরে উৎপাদন হয় প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার। বাকি অংশটি আসে পাইকারি বিক্রেতা, পরিবহন এবং খুচরো বাজার থেকে।
এই শিল্পের মোট বার্ষিক আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে দিওয়ালির ঠিক আগের এবং পরের ৩০ দিনের মধ্যে। এছাড়া কেরালার বিষু ও মহারাষ্ট্রের গণেশ চতুর্থীর মতো উৎসবেও বাজির ভালো চাহিদা থাকে।
বিশ্বজুড়ে চীনের একচ্ছত্র দাপট: ভারতের সঙ্গে বিশাল ব্যবধান
বিশ্বজুড়ে বাজি বা আতশবাজির বাজারে চীনের দাপট একচ্ছত্র। রাষ্ট্রসংঘের ‘UN Comtrade’-এর তথ্য অনুযায়ী, চীন প্রতি বছর প্রায় ১.১ বিলিয়ন থেকে ১.২৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বাজি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে। সেখানে ভারতের বার্ষিক রপ্তানি মাত্র ৭.৫৭ লাখ ডলারের কাছাকাছি!
চীনের হুনান প্রদেশের ‘লিউয়াং’ শহর হলো বিশ্ব বাজি উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু। চীনের মোট উৎপাদনের ৬০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই আসে এই শহর থেকে। কম উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা, সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা এবং শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন থাকার কারণে চীন বিশ্ববাজারে সবাইকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।
রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারতের প্রধান বাধাগুলি কী কী?
ভারতীয় বাজি প্রস্তুতকারকদের আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে:
পরিবহন ও সুরক্ষার কড়াকড়ি: বাজিকে বিপজ্জনক বিস্ফোরক দ্রব্যের তালিকায় রাখা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিবহণ, বিশেষ প্যাকেজিং, বিমা এবং বন্দরে বাজি ওঠানো-নামানোর খরচ অনেকটাই বেড়ে যায়।
আইনি জটিলতা ও লাল ফিতের ফাঁস: শিবকাশীর বাজি শিল্পকে প্রশাসনিকভাবে ‘রেড ক্যাটাগরি’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিভাগে রাখা হয়েছে। অথচ ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ দিন ধরে এটিকে কম ঝুঁকিপূর্ণ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন।
রাসায়নিক কাঁচামালের ওপর নিষেধাজ্ঞা: বাজি তৈরিতে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু কেমিক্যালের ওপর ভারতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ‘বেরিয়াম নাইট্রেট’-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় বিশ্ববাজারে ব্যবহৃত অনেক আধুনিক বাজির ফর্মুলেশন তৈরি করতে সমস্যায় পড়ছেন ভারতীয় প্রস্তুতকারকরা।
বিশ্ববাজারে চীনকে টেক্কা দিতে ভারতের করণীয় কী?
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত যদি আতশবাজি রপ্তানি বাড়াতে চায়, তবে শিবকাশীর বাজি শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি, মাননিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সার্টিফিকেশনের ওপর জোর দিতে হবে।
একই সঙ্গে শিবকাশীতে একটি বিশ্বমানের যৌথ টেস্টিং সেন্টার, উন্নত প্যাকেজিং ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক ছাড়পত্রের প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে। ছোট বাজি প্রস্তুতকারকদের সরাসরি বিদেশি ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক ডিস্ট্রিবিউটারদের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এই সমস্ত সমস্যা দূর করতে পারলে তামিলনাড়ুর শিবকাশী খুব শীঘ্রই চীনের লিউয়াংকে টেক্কা দিয়ে বৈশ্বিক বাজি বাজারের দখল নিতে সক্ষম হবে।