উৎসবের মিষ্টিতেই লুকিয়ে ঘাতক বিষ! ইউরিয়া-ডিটারজেন্ট মেশানো ভেজাল চিনবেন কী করে?

উৎসবের আনন্দ মানেই চনমনে আমেজ আর বাড়িতে হরেক রকমের মিষ্টির সমাহার। বরফি, লাড্ডু কিংবা রসগোল্লা ছাড়া বাঙালির উদযাপনের কথা ভাবাই যায় না। কিন্তু আপনি কি আদৌ জানেন, আপনার এই আনন্দকে মাটি করতে বাজারে সক্রিয় রয়েছে এক শ্রেণির অসাধু চক্র? উৎসবের মরসুমে চাহিদা তুঙ্গে থাকায় বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল মিষ্টি, যা তৈরির সময় স্বাস্থ্যবিধি বা পরিচ্ছন্নতার বালাই তো রাখাই হয় না, উল্টে তাতে মেশানো হচ্ছে মারাত্মক সব রাসায়নিক ও বিষাক্ত উপাদান।
মিষ্টির অন্দরে কী কী লুকিয়ে থাকতে পারে?
অতিরিক্ত মুনাফা লোটার লোভে অসাধু ব্যবসায়ীরা মিষ্টির প্রধান উপাদান ‘মাওয়া’ (দুধ থেকে তৈরি ঘন খোয়া)—এর ওজন ও পরিমাণ বাড়াতে দেদার মিশিয়ে দিচ্ছে স্টার্চ, চাল বা গমের আটা, ক্ষতিকর ডিটারজেন্ট, এমনকি ইউরিয়া পর্যন্ত! খাঁটি ঘিয়ে ভাজার কথা বলা হলেও বাস্তবে ব্যবহার করা হচ্ছে সস্তা বনস্পতি (হাইড্রোজেনেটেড ভেজিটেবল অয়েল), পাম অয়েল, সেদ্ধ আলু, বা পশুর চর্বি।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হল মিষ্টির সৌন্দর্য বাড়াতে যে পাতলা রুপালি আস্তরণ বা তবক ব্যবহার করা হয়, যাকে ৯৯.৯% বিশুদ্ধ রূপো বলে চালানো হয়, তা আদতে বিষাক্ত অ্যালুমিনিয়ামের পাতও হতে পারে। এছাড়া মিষ্টি আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘মেটানিল ইয়েলো’ (Metanil Yellow) এবং ‘ম্যালাকাইট গ্রিন’ (Malachite Green)-এর মতো ক্ষতিকর রং। জেনে রাখুন, এগুলি মূলত কাপড় রং করার কাজে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক, যা মানবদেহে ক্যানসারের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আসল ও ভেজাল মিষ্টির ফারাক বুঝবেন কী করে?
-
অতিরিক্ত উজ্জ্বল বা চোখে লাগার মতো চকচকে কড়া রঙের মিষ্টি দেখলেই এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলিতে ক্যানসারজেনিক কেমিক্যাল থাকতে পারে।
-
মিষ্টির উপর থাকা রুপোর তবক আসল না নকল তা যাচাই করতে আঙুলের ডগায় ঘষে দেখুন কিংবা সামান্য আগুনের শিখার কাছে ধরুন। আসল রূপো হলে তা ঘষলেই মিশে যাবে, কিন্তু অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল হলে তা অক্ষত থাকবে বা কালো হয়ে পুড়ে যাবে।
-
মিষ্টি থেকে কোনওরকম টক বা অস্বাভাবিক গন্ধ বের হলে কিংবা তাতে সামান্য ছত্রাক বা মোল্ডের লক্ষণ দেখলে ভুলেও তা মুখে তুলবেন না।
-
মিষ্টি কেনার সময় সবসময় নিশ্চিত হোন যে বিক্রেতার বৈধ FSSAI লাইসেন্স রয়েছে কি না এবং প্যাকেটের গায়ে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ঠিকঠাক রয়েছে কি না। কোনো মিষ্টি নিয়ে সন্দেহ হলে সরাসরি ‘ন্যাশনাল কনজিউমার হেল্পলাইন’ (NCH) কিংবা FSSAI-এর ‘ফুড সেফটি কানেক্ট’ অ্যাপে অভিযোগ জানান।
খাদ্যে বিষক্রিয়া: লক্ষণ ও প্রভাব
দূষিত বা ভেজাল মিষ্টি খেয়ে ফেললে শরীরে সালমোনেলা (Salmonella), ই. কোলাই (E. coli) বা নোরোভাইরাসের মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস আক্রমণ করতে পারে। মিষ্টি খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর থেকেই এর উপসর্গ প্রকাশ পেতে শুরু করে।
প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে—অবিরাম পাতলা পায়খানা, পেটে তীব্র মোচড়, বমি ভাব, বারবার বমি, জ্বর, সারা শরীরে যন্ত্রণা, কাঁপুনি এবং চরম দুর্বলতা। অনেক সময় মৃদু সংক্রমণে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ওরাল রিহাইড্রেশনের মাধ্যমে ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সুস্থ হওয়া সম্ভব।
কখন চিকিৎসকের কাছে ছোটাবেন?
পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়ার আগেই নিজের বা পরিচিত কারও ক্ষেত্রে নিচের এই গুরুতর লক্ষণগুলি দেখা মাত্রই দেরি না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন:
-
বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত হওয়া।
-
উচ্চ মাত্রায় জ্বর (শিশুদের ক্ষেত্রে ১০২° ফারেনহাইট বা ৩৮.৯° সেলসিয়াসের বেশি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ১০৩° ফারেনহাইট বা ৩৯.৪° সেলসিয়াসের বেশি)।
-
অবিরাম বমি হওয়া, যার ফলে সামান্য জল বা তরলও পেটে ধরে রাখা যাচ্ছে না।
-
তীব্র জলশূন্যতা (যেমন—প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা দাঁড়ানোর সময় মাথা ঘুরে যাওয়া)।
-
স্নায়ুসংক্রান্ত সমস্যা (যেমন—দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া বা সবকিছু দুটো দেখা, পেশির চরম দুর্বলতা, শরীরে ঝিনঝিন করা, কিংবা কথা বলতে ও খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া)।
-
তাছাড়া কোনো রকম উন্নতি ছাড়াই ডায়রিয়া যদি একটানা ৩ দিনের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসা করাতে হবে।