ধনতেরাসে ১৩, ভূত চতুর্দশীতে ১৪ আর দীপাবলিতে ২১! কোন দিনে কটি প্রদীপ জ্বালালে ভাগ্য বদলাবে? জেনে নিন আসল কারণ

আর মাত্র কয়েক দিন পরেই ঘরে ঘরে শুরু হতে চলেছে আলোর উৎসব দীপাবলি। দুর্গাপুজো ও লক্ষ্মীপুজোর আনন্দ মেটার পরেই বাঙালির মনে এখন জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে দীপাবলি এবং ভাইফোঁটাকে ঘিরে। আলোর এই উৎসব মানেই আনন্দ, উল্লাস এবং অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে সুন্দরকে স্বাগত জানানো। কার্তিক মাসের এই বিশেষ দিনগুলির প্রতিটির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য। আর এই ৪ দিনের উৎসবের প্রতিটি দিনেই নির্দিষ্ট সংখ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর প্রাচীন প্রথা চলে আসছে, যার নেপথ্যে রয়েছে বিশেষ কিছু কারণ।

১. ধনতেরাস (৬ নভেম্বর, শুক্রবার) – ১৩টি প্রদীপ
কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে ধনতেরাস পালন করা হয়। এই তিথির মাহাত্ম্য অনুসারে এদিন মোট ১৩টি প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম রয়েছে।

যমরাজের উদ্দেশ্যে প্রথম প্রদীপ: এর মধ্যে প্রথম প্রদীপটি দক্ষিণ দিক মুখ করে জ্বালানো হয় মৃত্যুর দেবতা যমরাজের উদ্দেশ্যে, যাতে পরিবারের সদস্যদের অকালমৃত্যু বা বিপদ থেকে রক্ষা করা যায়।

স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি: বাকি প্রদীপগুলি স্বাস্থ্য, মা লক্ষ্মী ও কুবের দেবতাকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে জ্বালানো হয়। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ১৩টি প্রদীপ বছরের ১৩টি চন্দ্র মাস বা ১৩টি জীবনীশক্তিরও প্রতীক।

২. ভূত চতুর্দশী (৭ নভেম্বর, শনিবার) – ১৪টি প্রদীপ
এই দিনটিকে অনেকেই ‘বাঙালির হ্যালোউইন’ বলে অভিহিত করে থাকেন। কার্তিক মাসের এই চতুর্দশী তিথিতে বাড়িতে ১৪টি প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা রয়েছে।

পূর্বপুরুষদের আবাহন: লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ রাতে আমাদের চৌদ্দ পুরুষের পূর্বপুরুষরা মর্ত্যে নেমে আসেন তাঁদের বংশধরদের আশীর্বাদ করতে। সেই অন্ধকার ফুঁড়ে তাঁদের পথ দেখাতেই ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো হয়।

অশুভ শক্তি বিনাশ: মনে করা হয়, এই দিন প্রদীপ জ্বালালে ঘরের আশেপাশে কোনো অশুভ শক্তি ঘেঁষতে পারে না। এর পাশাপাশি এই দিন নিয়ম করে ১৪ শাক খাওয়ার রেওয়াজও রয়েছে।

৩. দীপাবলি ও কালীপুজো (৯ নভেম্বর, সোমবার) – ২১টি প্রদীপ
দীপাবলির অমাবস্যার রাতে ধন-সম্পদের দেবী মা লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের পূজা করা হয়। এই পবিত্র রাতে মা লক্ষ্মীকে স্বাগত জানাতে এবং ঘরের প্রতিটি কোণ আলোকিত করতে ২১টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। ত্রেতাযুগে রামচন্দ্র লঙ্কা জয় করে ১৪ বছরের বনবাস কাটিয়ে অযোধ্যায় ফেরার দিনেও গোটা নগরী প্রদীপের আলোয় সেজে উঠেছিল। এর ঠিক আগের দিন অর্থাৎ রবিবার বাংলায় কালীপুজো উদযাপিত হবে।

কেন ঠিক ২১টি প্রদীপই জ্বালানো হয়?
হিন্দু দর্শনে ২১ সংখ্যাটির গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে:

৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক)

৫টি কর্মেন্দ্রিয় (হাত, পা, মুখ, মলদ্বার, জননাঙ্গ)

৫টি প্রাণ বা বায়ু (শরীরের ভেতরের পাঁচটি প্রাণশক্তি)

৫টি উপাদান (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম— অর্থাৎ মাটি, জল, আগুন, বাতাস ও আকাশ)

১টি মন বা আত্মা

এই মোট ২১টি উপাদানের শুদ্ধিকরণ করার উদ্দেশ্যেই ২১টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, সংখ্যার বিচারে ২১-এর যোগফল (২+১=৩) দেবগুরু বৃহস্পতির সংখ্যাকে নির্দেশ করে। ফলে এই প্রদীপের আলোয় ঘরের সমস্ত বাস্তুদোষ কেটে পজিটিভ এনার্জির সঞ্চার হয়।

৪. ভাইফোঁটা (১১ নভেম্বর, বুধবার) – ৫টি প্রদীপ
ভাইফোঁটার দিন ৫টি প্রদীপ জ্বালানোর বিশেষ নিয়ম রয়েছে। এই ৫টি প্রদীপ মূলত পঞ্চভূতের (মাটি, জল, আগুন, বাতাস ও আকাশ) প্রতীক, যা ভাইয়ের রক্ষাকর্তা হিসেবে কাজ করে। ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও তেজ কামনা করে বোনেরা এই প্রদীপ জ্বালান। অনেকে মনে করেন, এই ৫ প্রদীপ উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম এবং আকাশ— এই পাঁচ দিক থেকেই আসা সমস্ত বিপদ থেকে ভাইকে রক্ষা করে।

শাস্ত্র মতে, মাটির প্রদীপের আধার আমাদের নশ্বর দেহ, তেল বা ঘি আমাদের কর্ম এবং তুলোর বাতি আমাদের অহংকার ও আত্মাকে নির্দেশ করে। প্রদীপ জ্বালানোর অর্থ হলো আমাদের শরীরের সমস্ত অজ্ঞানতা দূর করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া, যা গৃহের সমস্ত নেতিবাচক শক্তি দূর করে মনকে পবিত্র ও শান্ত রাখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *