শহরের বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়া! কালীপুজোর আগেই চরম বিপদের মুখে কলকাতা, ফুসফুস বাঁচাতে মানুন এই জরুরি টিপস

শীতের আমেজ পড়তে না পড়তেই ধেয়ে আসছে অদৃশ্য এক শত্রু। গত কয়েক বছর ধরে দীপাবলি ও কালীপুজোর আনন্দ ফিকে করে দিচ্ছে মারাত্মক বায়ুদূষণ। শুধু দিল্লি নয়, উৎসবের ঠিক আগে কলকাতার আবহাওয়া ও বাতাসের মান নিয়েও তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ। গবেষকদের মতে, হেমন্ত ও শীতের মরশুমে শহরের বাতাস কার্যত ‘বিষাক্ত’ হয়ে ওঠে, যা মানবদেহের ফুসফুস থেকে শুরু করে হার্ট, চোখ ও ত্বকের ওপর সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
কলকাতার বাতাসের বর্তমান হাল কী?
পরিবেশ ও তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট aqi.in-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতার বাতাসে দূষণের মাত্রা বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এই মুহূর্তে শহরের গড় AQI (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) ১৯৬-এর কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে।
-
PM2.5-এর মাত্রা: প্রতি ঘনমিটারে ১১৮ মাইক্রোগ্রাম ($\mu g/m^3$)
-
PM10-এর মাত্রা: প্রতি ঘনমিটারে ১০৫ মাইক্রোগ্রাম ($\mu g/m^3$)
ভারতের জাতীয় মানদণ্ড অনুযায়ী, দৈনিক প্রতি ঘনমিটার বাতাসে PM10 এবং PM2.5-এর নিরাপদ মাত্রা যথাক্রমে ১০০ ও ৬০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। ফলে কলকাতার বাতাসে এই ধূলিকণার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে এই বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকদের মতে, কালীপুজো ও শীতের দাপট বাড়লে এই পরিস্থিতি আরও অবনতিশীল হবে।
ফুসফুসের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর এই দূষণ?
শীতকাল মানেই সিওপিডি (COPD) বা হাঁপানি রোগীদের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। সিকে বিড়লা ও সিএমআরআই হাসপাতালের বিশিষ্ট পালমোনোলজিস্ট ডা. অরূপ হালদারের মতে, এই সময়ে তাপমাত্রার বিপরীত অবস্থা বা ‘টেম্পারেচার ইনভার্সন’-এর ফলে বায়ুদূষণ বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাতাসে ভাসমান অতিক্ষুদ্র কণা PM2.5 সরাসরি ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে স্থায়ী ক্ষতি করে। চিকিৎসকের সতর্কবার্তা, বায়ুদূষণের কারণে যদি রোগীর শারীরিক অবস্থার হঠাৎ মারাত্মক অবনতি ঘটে (যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় ‘এক্সজ়ারবেশন’ বা ‘লাং অ্যাটাক’ বলা হয়), তবে ফুসফুস আর কখনই আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। তীব্র শীতে ঘন ঘন এই লাং অ্যাটাকের জেরে সিওপিডি রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি হতে পারে। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও দীর্ঘক্ষণ এই বাতাসে ঘোরাফেরা করলে বুকে কফ জমা, নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
হার্ট, চোখ ও ত্বকের ওপর মারাত্মক প্রভাব
বায়ুদূষণের জেরে শুধু শ্বাসতন্ত্র নয়, শরীরের অন্যান্য vital organs-ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে:
-
হৃদরোগের ঝুঁকি: পিএম২.৫-এর মতো অতিসূক্ষ্ম কণা রক্তে জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে রক্তনালী শক্ত হয়ে যায় এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। কার্ডিয়োলজিস্ট ডা. সৌমিক চৌধুরীর মতে, দূষণের জেরে নিউমোকক্কাল বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সংক্রমণ বাড়লে তা সরাসরি হার্টকে দুর্বল করে দেয়।
-
চোখের সমস্যা: চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অনিন্দ্য কিশোর মজুমদার জানান, এই মরশুমে ড্রাই আইজ, চোখ লাল হওয়া, কনজাংটিভাইটিসের পাশাপাশি গ্লকোমা ও রেটিনোপ্যাথির মতো জটিল রোগও দ্রুত বাড়ছে। এমনকি অতিরিক্ত দূষণের সংস্পর্শে অন্ধত্বের ঝুঁকি পর্যন্ত থাকতে পারে।
-
ত্বক ও চুল: চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মধুমিতা ভট্টাচার্যের মতে, দূষণের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাবলয় নষ্ট করে দেয়। ফলে অকাল বার্ধক্য, ব্রণ, দাগছোপের পাশাপাশি স্ক্যাল্প শুষ্ক হয়ে চুল পড়ার সমস্যাও বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই বিপদ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে?
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে এই কটা দিন কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি: ১. বাড়ির বাইরে বেরোলে অবশ্যই N95 মাস্ক ব্যবহার করুন। ২. শীতকালে খুব ভোরে প্রাতঃভ্রমণে না বেরিয়ে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টের মধ্যে হাঁটুন। নিয়মিত AQI চেক করুন। ৩. ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা সময়মতো নিয়ে রাখুন। ফুসফুসের ক্রনিক রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইনহেলার বা ওষুধ বন্ধ করবেন না। ৪. ঘরের ভিতরের দূষণ কমাতে প্রয়োজনে ভালো এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন। তবে একই সঙ্গে এসি ও পাখা একসঙ্গে চালিয়ে ঘুমানো এড়িয়ে চলুন।