‘অ্যাক্সিডেন্টাল সেনেটর’ থেকে সোজা মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী? জন ওসফকে নিয়ে তুঙ্গে জল্পনা

২০২১ সালে প্রথম বার নির্বাচনে জিতেও যাঁর গায়ে সেঁটে গিয়েছিল ‘অ্যাক্সিডেন্টাল সেনেটর’-এর তকমা, আজ তিনিই মার্কিন রাজনীতির সবচেয়ে বড় চমক। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রবীণ এবং নানা বিতর্কে বিদ্ধ থাকায় ভোট বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলেন তরুণ মুখ জন ওসফ সহজেই জিতে যাবেন। জিতেছিলেন ঠিকই, তবে সামান্য ব্যবধানে। এর তিন বছর পরে ট্রাম্প যখন সেই জর্জিয়া রাজ্য দখল করে নেন, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন ওসফের রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ। কিন্তু সমস্ত হিসেব উল্টে দিয়ে সেই জর্জিয়া থেকেই ফের সেনেটর নির্বাচিত হলেন ওসফ! শুধু তাই নয়, ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখতে শুরু করে দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আমেরিকার রাজনীতিতে ৪০ ছুঁইছুঁই জন ওসফকে এখন বলা হচ্ছে ‘দ্বিতীয় বারাক ওবামা’।

ওবামার কার্বন কপি! বাগ্মিতা থেকে শরীরী ভাষা

২০০৮ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে ওবামা যখন প্রথম বার প্রেসিডেন্ট হন, তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ভাষণ ও অনন্য ব্যক্তিত্ব সারা বিশ্বে ঝড় তুলেছিল। ওসফের মধ্যেও ঠিক সেই একই জাদুকরী ছাপ দেখতে পাচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। দু’জনের কথা বলার ধরন, নিখুঁত টাইমিং এবং আত্মবিশ্বাসী শরীরের ভাষায় রয়েছে অদ্ভুত মিল। ওবামা যেমন জামার হাতা গুটিয়ে ভাষণ দিতেন, ওসফও হুবহু সেই স্টাইল বজায় রাখেন। সুঠাম চেহারা, তীক্ষ্ণ চোয়াল আর পরিপাটি চুলের গড়নে ওসফের মাঝে যেন তরুণ ওবামার ছায়াই দেখতে পান সাধারণ মার্কিনীরা। খোদ প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মিড টার্ম নির্বাচনে ওসফের হয়ে প্রচার করতে গিয়ে বলেছিলেন, “সাধারণ বুদ্ধিতে জন ওসফ ছাড়া আর কাউকেই বেছে নেওয়া যায় না। কারণ আমাদের দু’জনেরই মেন্টর একই ব্যক্তি—জন লিউস।”

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আক্রমণ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল স্ট্র্যাটেজি

এবারের ভোটের প্রচারপর্বের শুরু থেকেই নিজের ঝাঁঝালো ভাষণে নজর কেড়েছেন ওসফ। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর পরিবারকে নিশানা করে ‘এপস্টিন ক্লাস’ কিংবা ‘মার-A-লাগো মাফিয়া’র মতো তীব্র কটাক্ষ ছুড়ে দিয়েছেন, যা মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। রিপাবলিকানদের অস্বস্তিতে ফেলার যে দুর্দান্ত কৌশল ওসফ রপ্ত করেছেন, তা ডেমোক্র্যাট শিবিরের অনেকের মধ্যেই দেখা যায় না। মিড টার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পর ট্রাম্পকে ‘ব্যর্থ লেইম ডাক প্রেসিডেন্ট’ বলে আক্রমণ করে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকানরা এই খামখেয়ালি ও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

২০২৮-এর হোয়াইট হাউস রেসে হু হু করে বাড়ছে দর

ভোট মিটতেই আমেরিকার রাজনীতিতে এখন একটাই আলোচনা—২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে হবেন ডেমোক্র্যাটদের মুখ? সেই দৌড়ে সবার আগে উঠে আসছে জন ওসফের নাম। পলিমার্কেটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে সোজা ২৪ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা ১০.৫ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ১৮ শতাংশে উঠেছে। তালিকায় তিনি এখন ডেমোক্র্যাট নেত্রী আলেকজ়ান্দ্রা ওকাসিও-কর্টেজ়ের চেয়ে চার পয়েন্ট এবং রিপাবলিকান নেতা তথা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের চেয়ে পাঁচ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছেন।

আটলান্টা থেকে সংসদীয় লড়াই: এক নজরে ওসফ

১৯৮৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আটলান্টার এক ইহুদি পরিবারে জন্ম জন ওসফের। তাঁর বাবা রুশ ও লিথুয়ানিয়ান ইহুদি বংশোদ্ভূত এবং মা অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে পূর্ব ইউরোপে ইহুদি নিধনযজ্ঞের সময় ওসফের পিতামহ আমেরিকায় পালিয়ে আসেন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকস থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তথ্যচিত্র নির্মাণকারী সংস্থায় সিইও হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০১৭ সালে রাজনীতিতে পা রেখে একবার হোঁচট খেলেও, ২০২১ সালের মিড টার্ম নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নিয়ে আজ তিনি মার্কিন রাজনীতির ভবিষ্যতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *