বঙ্কিমচন্দ্রের ভবানী পাঠকের স্বপ্নাদেশ ও নদীর মাটি-গোবরের প্রতিমা! ৪০০ বছরের অলৌকিক ‘গোবরজোনা’ কালীর কাহিনি

কালীপুজোর রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারে কালিন্দী নদীর বুক চিরে ভেসে চলত ডাকাতদের সশস্ত্র বজরা। আর সেই বজরার ছাদ থেকে ভেসে আসত দেবীর করাল রূপের বন্দনা। ৪ শতাব্দী পেরিয়ে আজও সেই ইতিহাসকে বুকে আগলে রেখেছে মালদার পুখুরিয়া থানার আড়াইডাঙা এলাকার ‘গোবরজোনা কালীপুজো’। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এর অন্যতম প্রধান চরিত্র ডাকাত সম্রাট ভবানী পাঠক এবং দেবী চৌধুরানীর স্মৃতিবিজড়িত এই পুজো কেবল ইতিহাসের সাক্ষী নয়, বরং আজও তা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক অটুট ও অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন।
কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে প্রাচীন প্রথা মেনেই মহা ধুমধামের সাথে আয়োজিত হয় এই বিশেষ পুজো। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এলাকার হিন্দু ও সংখ্যালঘু উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই পুজো ও মেলায় মেতে ওঠেন।
কালিন্দী নদীর মাটি আর গোবর দিয়ে দেবীর আগমন
পুজোর ইতিহাস সম্পর্কে অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা সৌমেন চৌধুরী জানান, জনশ্রুতি অনুযায়ী আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে ডাকাত দলপতি ভবানী পাঠক কালিন্দী নদী ধরে পূর্ববঙ্গে ডাকাতি করতে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে আড়াইডাঙা এলাকায় নদীর ধারে নিজের বজরা বাঁধেন তিনি। সেখানকার একটি ঘন আমবাগানে দলবল নিয়ে শিবির করে বিশ্রাম নেওয়ার সময় ভবানী পাঠক স্বপ্নাদেশ পান।
স্বপ্নে দেবী কালী তাঁকে ওই আমবাগানেই বেদি বা থান তৈরি করে অবিলম্বে পুজো শুরু করার নির্দেশ দেন। স্বপ্নাদেশ পেয়েই আর দেরি করেননি ডাকাত সরদার। কালিন্দী নদীর তলের মাটি ও গোবর একসঙ্গে মেখে তৈরি করা হয় দেবীর প্রথম মূর্তি। আর গোবর ও নদীর মাটি দিয়ে দেবীমূর্তি তৈরি হয়েছিল বলেই এই পুজোর নাম হয়ে যায় ‘গোবরজোনা কালীপুজো’।
অটুট ৪ শতকের ঐতিহ্য ও বলিপ্রথা
দীর্ঘসময় ধরে ভবানী পাঠক ও তাঁর ডাকাত দলই নিশুতি রাতে এই পুজোর আয়োজন করত। ব্রিটিশ শাসনকাল এবং তারও আগে মুসলিম নবাবদের আমলেও এই পুজো একই তান্ত্রিক নিয়মে নির্বিঘ্নে হয়ে এসেছে। পরবর্তীকালে এলাকায় লোকালয় গড়ে উঠলে আড়াইডাঙার স্থানীয় গ্রামবাসী ও চৌধুরী পরিবার যৌথভাবে এই ঐতিহ্যবাহী পুজোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়।
অবশ্য লোকমুখে এই পুজোকে ঘিরে আরও একটি অলৌকিক প্রচলিত মত রয়েছে। একসময় এই পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটলে মহামারির হাত থেকে গ্রামবাসীদের রক্ষা করতে দেবী কালীর শরণাপন্ন হওয়া হয়েছিল এবং সেই সংকটকাল থেকেই এই সার্বজনীন পুজোর সূচনা।
বর্তমানে সারা বছরই এই মন্দিরে নিত্যপুজো চলে। প্রথা মেনে বিশেষ পুজোর দিন দেবীকে বাতাসা ও অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। বলিদানের প্রাচীন নিয়ম মেনে এখনও ছাগ ও মহিষ বলির প্রথা অটুট রয়েছে। পুজো উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে বসে বিশাল মেলা। মানত পূরণ ও দেবীর আশীর্বাদ লাভের আশায় প্রতিদিন মালদা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী একাধিক জেলা থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার ভক্ত ছুটে আসেন ৪০০ বছরের এই অলৌকিক দেবীস্থানে।