বাংলায় নতুন শিল্প বিপ্লব! সেমিকন্ডাক্টর থেকে গ্রিন হাইড্রোজেন—বিনিয়োগকারীদের জন্য বিরাট আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

রাজ্যের বন্ধ শিল্পে প্রাণপ্রতিষ্ঠা, নতুন কলকারখানা স্থাপন এবং বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হলো বহু প্রতীক্ষিত ‘পশ্চিমবঙ্গ বিনিয়োগ প্রসার নীতি, 2026’। বৃহস্পতিবার নিউটাউনের ‘উৎসারী’ সভাগৃহে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে এই মেগা শিল্পনীতির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিশিষ্ট শিল্পপতিদের উপস্থিতিতে ঘোষিত এই নতুন নীতিতে রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একের পর এক অভূতপূর্ব আর্থিক ছাড় এবং সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজ্য সরকার জানিয়েছে, চলতি বছরের ৯ মে বা তার পরবর্তী সময়ে হওয়া যেকোনো নতুন বিনিয়োগ এই প্রকল্পের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। উৎপাদন শুরুর দিন থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কিংবা নির্ধারিত আর্থিক ঊর্ধ্বসীমা না ছোঁয়া পর্যন্ত এই সহায়তা বজায় থাকবে।
নতুন শিল্পনীতিতে কী কী বড় আর্থিক সুবিধা মিলছে?
বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে এবং রাজ্যে শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে নীতিমালায় বেশ কিছু দারুণ সুযোগ রাখা হয়েছে:
-
বিনিয়োগে অতিরিক্ত ভর্তুকি: সাধারণ ক্ষেত্রে অনুমোদিত স্থায়ী মূলধনী বিনিয়োগের (FCI) ১০০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি সহায়তা মিলবে। তবে সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি, মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা সামগ্রীর মতো বিশেষ ‘থ্রাস্ট সেক্টর’-এ বিনিয়োগ এলে তা বাড়িয়ে ১১০ শতাংশ এবং পিছিয়ে থাকা এলাকায় তা ১২০ শতাংশ পর্যন্ত করা হবে।
-
কর ও বিদ্যুৎ শুল্ক ছাড়: শিল্প ইউনিটগুলি উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে প্রথম ১০ বছর তাদের জমা দেওয়া নেট এসজিএসটি-র (Net SGST) সমপরিমাণ ১০০ শতাংশ অর্থ রিফান্ড বা ফেরত পাবে। এছাড়া টানা পাঁচ বছর সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ শুল্ক মকুব এবং ২০৩০ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ওপেন অ্যাক্সেসে সবুজ বিদ্যুৎ ক্রয়ে সারচার্জ ও মাশুলে বড় ছাড় দেওয়া হবে।
-
স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি মকুব: কারখানা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রথমবার জমি কেনা বা লিজ নেওয়ার ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ ১০০ শতাংশ প্রতিপূরণ মিলবে।
কর্মসংস্থান ও ইপিএফ (EPF) ভর্তুকি
রাজ্যের ছেলেমেয়েদের চাকরির সুযোগ বাড়াতে এবং বিশেষ করে নারী ক্ষমতায়নে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এমএসএমই (MSME) শিল্পে কর্মরত পুরুষ কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিধি বা ইপিএফ-এ নিয়োগকর্তার অংশের ৫০ শতাংশ এবং মহিলা ও রূপান্তরকামীদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ অনুদান দেবে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি বৃহৎ শিল্পেও নির্দিষ্ট সংখ্যায় স্থানীয় কর্মী নিয়োগের শর্তে ইপিএফ খরচে বড় অঙ্কের ভর্তুকি পাওয়া যাবে।
আমলাতান্ত্রিক জট কাটাতে ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ ও মেগা প্রজেক্ট
শিল্পস্থাপনে অতীতে যে সমস্ত লালফিতের ফাঁস ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অভিযোগ উঠত, তা পুরোপুরি দূর করতে এবার থেকে সমস্ত আবেদন, অনুমোদন ও অনুদান বণ্টন হবে ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ পোর্টালের মাধ্যমে। আবেদন জমা পড়ার মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে প্রাথমিক শংসাপত্র এবং উৎপাদন শুরুর ৪৫ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন মিলবে।
বিশেষ করে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লালফিতের ফাঁস কাটাতে খোদ আমলাদের সরাসরি নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে:
-
১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট বিজ়নেস ম্যানেজার থাকবেন।
-
৫০০ কোটি টাকার বেশি লগ্নিতে বরিষ্ঠ আধিকারিক এবং ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হলে বিশেষ সচিব নিযুক্ত হবেন।
-
এছাড়া আড়াই হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমন্বয় রক্ষায় সরাসরি খোদ সচিব পদমর্যাদার আধিকারিক দায়িত্ব সামলresiduals বা তদারকি করবেন।
পরিবেশের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে স্পঞ্জ আয়রন, গতানুগতিক ইটভাটা, বাজি কারখানা কিংবা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের মতো দূষণকারী ক্ষেত্রগুলিকে এই নীতির বাইরে রাখা হয়েছে। দুর্গাপূজার পর রাজ্যের এই মেগা শিল্পনীতি বাংলার অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।