আমেরিকার রাজনীতিতে এবার ‘ওবামা ২.০’! ট্রাম্পের সাম্রাজ্যে ধস নামিয়ে মার্কিন ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ সেনেটরের ঐতিহাসিক নজির

উজ্জ্বল বুদ্ধিমত্তা, সুসংহত চেহারা আর চমৎকার বাচনভঙ্গি—যার উপস্থিতিতে রাজনৈতিক সভা নিমেষেই পরিণত হয় এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত কথোপকথনে। তিনি জন অসফ (Jon Ossoff), আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ সেনেটর। যাঁকে ঘিরে এই মুহূর্তে সমগ্র আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। আমেরিকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি কেবল এক ‘লম্বা রেসের ঘোড়া’ নন, বরং প্রখ্যাত প্রবীণ ডেমোক্র্যাট অনুগামীরা তাঁর মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্যতম সফল প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার (Barack Obama) ছায়া!

২০২১ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে খুব সামান্য ব্যবধানে জয়ী হয়ে জর্জিয়া থেকে প্রথম বার সেনেটে প্রবেশ করেছিলেন জন। তখন তাঁকে বিরোধী শিবির ‘অ্যাক্সিডেন্টাল সেনেটর’ বলে খোঁচা দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্কিন মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনে যেভাবে বিশাল ব্যবধানে সেই আসন ধরে রাখলেন তিনি, তাতে কার্যত সমস্ত সমালোচক ও নিন্দুকদের মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

ট্রাম্পের দুর্গে অভূতপূর্ব আঘাত ও জয়ের ধারা

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জর্জিয়ার সিংহভাগ ভোটার রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে জর্জিয়ার প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার সরাসরি জন অসফকে ভোট দিয়েছেন।

জয়ের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তীব্র আক্রমণ করে জন বলেন, “ট্রাম্প একজন ব্যর্থ ও অযোগ্য প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার মানুষ তাঁর খামখেয়ালিপনা, দুর্নীতি ও অপশাসনকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আমাদের লক্ষ্য কেবল প্রেসিডেন্টের অপকর্মকে আটকে রাখা নয়, বরং দেশের গভীরে থাকা ক্ষতগুলিকে সারিয়ে তোলা।”

নাৎসি অত্যাচারের অতীত থেকে তদন্তমূলক সাংবাদিকতার পথ

১৯৮৭ সালে আটলান্টায় জন্ম জনের। তাঁর মা ছিলেন অস্ট্রেলীয় অভিবাসী এবং বাবা বেলারুশের ইহুদি পরিবার থেকে আসা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবারের অনেকেই নাৎসিদের নৃশংস অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু নিজে ইহুদি ধর্মাবলম্বী হয়েও ইজরায়েলের বর্তমান নীতি এবং ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ মনোভাবের ঘোর বিরোধী তিনি।

রাজনীতিতে তাঁর আত্মপ্রকাশ হুট করে হয়নি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রখ্যাত নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা জন লুইসের আত্মজীবনী পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁকে চিঠি লেখেন কিশোর জন। লুইস তাঁকে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেন। পরবর্তীতে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ও সম্মানীয় ‘লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স’ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি তদন্তমূলক সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। ২০১৩ সালে লন্ডনের ‘Insight TWI’ সংস্থার সিইও পদে বসে দুর্নীতি, যুদ্ধাপরাধ ও মানবপাচার নিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্যচিত্র তৈরি করেন। ২০১৭ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে তিনি পূর্ণসময়ের রাজনীতিতে যোগ দেন।

কেন তাঁকে ওবামার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে?

২০০৯ সালে ৪৭ বছর বয়সে বারাক ওবামা যেভাবে ৬২ বছরের অভিজ্ঞ জর্জ বুশের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী ধারা নিয়ে আলোড়ন ফেলেছিলেন, তরুণ জন অসফও ঠিক একই পথে হাঁটছেন।

  • একই বাচনভঙ্গি ও স্টাইল: আমেরিকার প্রখ্যাত সাংবাদিক এজরা কুইন ‘নিউ ইয়র্ক টাইমসে’ লিখেছেন, “জনের কথা বলার ভঙ্গি, মঞ্চে শার্টের হাতা গুটিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ধরন হুবহু ওবামাকে মনে করিয়ে দেয়।”

  • স্বয়ং ওবামার প্রশংসা: প্রচার সভায় নিজে উপস্থিত থেকে ওবামা তরুণ এই সেনেটরের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন, “জন অত্যন্ত জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান। জন লুইসের আদর্শে তৈরি একজন যোগ্য প্রতিনিধি।”

হোয়াইট হাউস বা বিরোধী শিবির তাঁকে ‘বিরক্তিকর’ বলে কটাক্ষ করার চেষ্টা করলেও বাস্তব সত্য হলো, মিডটার্ম নির্বাচনে এই অভাবনীয় জয়ের পর তিনি এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। মার্কিন রাজনৈতিক মহলের জোর জল্পনা, ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য বাজি হতে চলেছেন এই তরুণ প্রগ্রেসিভ নেতা ‘জন অসফ’!

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *