মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের আইনি ছাতা কেড়ে নেওয়ার চরম পদক্ষেপ? কেন্দ্রের মুখ বন্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টের বিরাট সমন!

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেষ কুমার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের (EC) পাওয়া বিশেষ আইনি সুরক্ষা বা ‘সুরক্ষাকবচ’ (Immunity)-এর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এক পিটিশনে এবার বড় পদক্ষেপ নিল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার সর্বোচ্চ আদালত এই সংবেদনশীল বিষয়ে কেন্দ্র সরকার এবং নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)—উভয় পক্ষকেই কড়া নোটিশ জারি করেছে।
মামলাটির শুনানিকালে দেশের প্রধান বিচারপতি (CJI) সূর্য কান্ত প্রকাশ্য আদালতে অসন্তোষ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন যে, একই বিষয়ে ইতিমধ্যে বেশ কিছু মামলা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। তিনি আবেদনকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমাদের একটাই অনুরোধ, আপনারা এই বিষয়ে আর নতুন করে আবেদন জমা দেওয়া বন্ধ করুন। এভাবে একের পর এক নতুন পিটিশন আসতে থাকলে মূল আইনি যুক্তির শুনানি শেষ করা যাবে না এবং মূল ইস্যু থেকে আমরা নজর হারিয়ে ফেলব। আজ অন্য এক মামলায় আমরা একই কথা বলেছি, মামলা একের পর এক আসতেই থাকছে, কিন্তু এর কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।”
আরজেডি সাংসদ ও আইনজীবীদের চাঞ্চল্যকর আবেদন
মূলত রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (RJD) প্রভাবশালী সাংসদ মনোজ ঝা এবং বিশিষ্ট আইনজীবী অরুণ কুমার আগরওয়ালের দায়ের করা পৃথক জনস্বার্থ পিটিশনের ওপর ভিত্তি করেই সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে এই নোটিশ পাঠিয়েছে। এর আগে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস’ (ADR)-এর করা একই ধরনের এক আবেদনের প্রেক্ষিতেও কেন্দ্রকে নোটিশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত।
দায়ের হওয়া এই নতুন পিটিশনগুলোতে ‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও মেয়াদ) আইন, ২০২৩’-এর ধারা ১৬ (Section 16)-এর বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, বিতর্কিত এই ধারাটি পুরোপুরি অসাংবিধানিক, যা নির্বাচন কমিশনের প্রাপ্ত ক্ষমতার একচ্ছত্র সীমা লঙ্ঘন করে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি ভারতীয় সংবিধানের ‘মূল কাঠামো’ (Basic Structure)-র ওপর সরাসরি আঘাত হানে। পিটিশনে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়, “এই আইনের ১৬ নম্বর ধারা সাংবিধানিক আদালতগুলোর বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার (Judicial Review) মৌলিক ক্ষমতাকে রুদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
আদালতে কী কী বিস্ফোরক যুক্তি পেশ করা হলো?
মামলাকারী অরুণ কুমার আগরওয়ালের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে অংশ নিয়ে আইনজীবী নেহা রাঠি বিস্ফোরক সওয়াল পেশ করেন। তিনি আদালতে জানান, ২০২৩ সালের আইনের ধারা ১৬ সোজা ভাষায় পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা অন্যান্য কমিশনাররা পদে থাকাকালীন তাঁদের নেওয়া কোনো পদক্ষেপ, সিদ্ধান্ত বা বক্তব্যের বিরুদ্ধে দেশের কোনো আদালতেই কোনো ধরনের দেওয়ানি (Civil) বা ফৌজদারি (Criminal) মামলা দায়ের করা যাবে না। শুধু পদে থাকার সময় নয়, দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁরা সারা জীবনের জন্য এই অভূতপূর্ব আইনি নিরাপত্তা ভোগ করবেন।
আইনজীবী আগরওয়াল আদালতে তাঁর যুক্তিতে বলেন, এই আইনের ১৬ নম্বর ধারায় নির্বাচন কমিশনারদের এতটাই বিস্তৃত ও অবাধ আইনি ছাড় দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে কোনো কমিশনারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ, নথিপত্রে কারচুপি কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অপরাধে যুক্ত থাকার প্রমাণ পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আইন বহির্ভূত কাজের ক্ষেত্রেও এই আজীবন ছাতা তাঁদের রক্ষা করবে, যা সাধারণ আইনের শাসনের পরিপন্থী।
সব পক্ষের প্রাথমিক বক্তব্য শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট নোটিশ জারি করার পাশাপাশি আগামী ১৮ ডিসেম্বর এই মেগা মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে। আগামী দিনে দেশের শীর্ষ আদালত এই বিতর্কিত ধারাটি নিয়ে কী ঐতিহাসিক রায় দেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দেশের রাজনৈতিক মহাকাশ।