দীপাবলিতে সোনা কেনার এটাই কি সেরা সময়? গত ৬ মাসে ১২% পতন, আগামী দিনে কি লাফিয়ে বাড়বে দাম?

আলোর উৎসব দীপাবলি মানেই সোনা কেনার ধুম। সাধারণত উৎসবের মরশুমে সোনার আকাশছোঁয়া দাম থাকলেও, চলতি বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য অপেক্ষা করছে এক দারুণ সুখবর! গত ছয় মাসে সোনার দামে প্রায় ১২ শতাংশের পতন দেখা গিয়েছে। তবে বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সোনার দামে বড়সড় উত্থান আসতে পারে। তাই এই দীপাবলিতে সোনা কেনার কথা ভাবলে এটাই উপযুক্ত সুযোগ হতে পারে।

দাম কিছুটা স্থির বা কম থাকায় বিনিয়োগকারীরা এখন প্রথাগত গহনার বদলে ‘গোল্ড এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড’ বা গোল্ড ETF (Gold ETF)-এর দিকে দ্রুত আকৃষ্ট হচ্ছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গোল্ড ETF-এ পরিচালিত মোট সম্পদ বা AUM প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে যা ছিল ১,৫৮,৪০০ কোটি টাকা, তা অক্টোবরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৯১,০০০ কোটি টাকায়। শুধুমাত্র অক্টোবর মাসেই গোল্ড ETF-এ প্রায় ৩,৩০০ কোটি টাকার নিট বিনয়োগ এসেছে।

গোল্ড ETF আসলে কী?
গোল্ড ETF হলো স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ড স্কিম, যা সরাসরি দেশীয় বাজারে ভৌত বা আসল সোনার দামকে ট্র্যাক করে। এতে প্রতিটি ইউনিটের মান সাধারণত ৯৯.৫% খাঁটি ১ গ্রাম আসল সোনার সমান হয়।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল তাদের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক রিপোর্টে জানিয়েছে, বর্তমান উৎসব ও বিয়ের মরশুম শুরু হওয়ায় সোনার চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি নিজেদের স্বর্ণভাণ্ডার বাড়াতে রেকর্ড গতিতে সোনা কেনা অব্যাহত রেখেছে। ফলে আগামী ১২ মাসে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া বাজারে সোনার দাম অনেকটাই বাড়তে পারে।

সাধারণ বাজারের চেয়ে বহুগুণ ভালো রিটার্ন
বিগত ১২ মাসের পারফরম্যান্স দেখলে বোঝা যায়, শেয়ার বাজারের সাধারণ রিটার্নের তুলনায় গোল্ড ETF অনেক বেশি লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে:

কোয়ান্টাম গোল্ড ETF: সর্বোচ্চ ১২.৮১% রিটার্ন

টাটা গোল্ড ETF: ১২.৬২% রিটার্ন

নিপ্পন ইন্ডিয়া গোল্ড ETF BeEs: ১২.৫৮% রিটার্ন

ইনভেসকো গোল্ড ETF: ১২.৫০% রিটার্ন

ICICI গোল্ড ETF: ১২.৩৯% রিটার্ন

পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর (২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর) দীপাবলির পর থেকে এখন পর্যন্ত গোল্ড ETF গড়ে প্রায় ৯.২২% শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে।

কেন এটি প্রথাগত সোনার চেয়ে বেশি লাভজনক?
ভারতে সোনা বা গহনা কেনা আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও আর্থিক ও ব্যবহারিক দিক থেকে গোল্ড ETF অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ:

১. মেকিং চার্জ নেই: দোকানে সোনা বা গহনা কিনতে গেলে প্রায় ১৫% পর্যন্ত মেকিং চার্জ (Making Charges) বা গড়াইয়ের মজুরি দিতে হয়। গোল্ড ETF-এ কোনো মেকিং চার্জ লাগে না।

২. চুরির ভয় ও লকার খরচ থেকে মুক্তি: এটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ডিমেট (Demat) অ্যাকাউন্টে সুরক্ষিত থাকে। তাই বাড়িতে চুরি হওয়ার ভয় বা ব্যাংকে লকার ভাড়া দেওয়ার বাড়তি খরচ নেই।

৩. কেনাবেচায় স্বচ্ছতা: আসল সোনা বিক্রি করার সময় খাদ কাটা বা টেস্টিং ফি হিসেবে দোকানদাররা টাকা কেটে নেয়। কিন্তু গোল্ড ETF লাইভ দামে NSE বা BSE-তে শেয়ারের মতোই সহজে ও স্বচ্ছ দামে কেনাবেচা করা যায়।

৪. কম টাকায় বা SIP-তে বিনিয়োগের সুযোগ: আসল সোনা কিনতে মোটা অঙ্কের টাকা লাগে, কিন্তু গোল্ড ETF-এ ১ গ্রামের সমপরিমাণ টাকা দিয়ে বা SIP-র মাধ্যমে মাসে মাত্র কয়েকশো টাকা দিয়েও সোনা জমানো শুরু করা সম্ভব।

বিগত বছরগুলির চোখধাঁধানো পরিসংখ্যান
ভ্যালু রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, গোল্ড ETF ক্যাটাগরি থেকে পাওয়া রিটার্নের হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

চলতি বছরে (YTD): ৬.৯৪%

১ বছরে: ১৮.৬৪%

৩ বছরে: ৩১.৯০%

৫ বছরে: ২৩.১৫%

বিশেষজ্ঞ কী বলছেন?
আর্থিক বিশেষজ্ঞ ও অপটিমা মানি-র প্রতিষ্ঠাতা পঙ্কজ মথপালের মতে, বিনিয়োগের চাহিদা এবং জোগানের ঘাটতির কারণে সোনার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। তবে সুদের হার বৃদ্ধি বা মার্কিন ডলার শক্তিশালী হলে সাময়িকভাবে সোনার দামে কিছুটা ওঠানামা দেখা দিতে পারে।

তাই এককালীন সমস্ত টাকা সোনাতে না ঢেলে বা হুটহাট দামের পিছে না ছুটে, পোর্টফোলিও সামঞ্জস্য রেখে গোল্ড ETF-এর মাধ্যমে প্রতি মাসে অল্প অল্প করে সোনা জমিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সোনাকে স্বল্পমেয়াদী মুনাফার বদলে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা ও ঝুঁকির ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেখাই শ্রেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *