সারা দেশ যখন লক্ষ্মী পূজায় মগ্ন, বাঙালি কেন দীপাবলিতে মেতে ওঠে কালী পূজায়? জানুন এই প্রাচীন রহস্য

দীপাবলি বা দেওয়ালি মানেই গোটা দেশ জুড়ে আনন্দ ও আলোর উৎসব। দেশের অধিকাংশ রাজ্যে যখন এই অমাবস্যার রাতে ধন-ধান্যের দেবী লক্ষ্মী এবং সিদ্ধিদাতা গণেশের আরাধনা করা হয়, ঠিক তখনই বাংলা মেতে ওঠে মা কালীর আরাধনায়, যা পরিচিত ‘শ্যামাপূজা’ বা ‘কালীপূজা’ নামে। কিন্তু দেশের অন্যান্য প্রান্তের থেকে বাঙালির এই ধর্মীয় ও সামাজিক প্রার্থনার ভিন্নতার রহস্য কী? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে বাংলার সুপ্রাচীন শাক্ত ঐতিহ্য এবং মাতৃসাধনার গভীর আধ্যাত্মিক চেতনার মধ্যে।

চলতি ২০২৬ সালে আগামী ৮ নভেম্বর, রবিবার পালিত হবে দীপাবলি এবং একই রাতে রাজ্য জুড়ে অনুষ্ঠিত হবে মা কালীর আরাধনা।

কেন দীপাবলিতে কালীপূজা করেন বাঙালিরা?
বাংলায় মা কালী কেবল সংহারের রূপ নন, তিনি পরম শক্তি এবং বিশ্বজনীন শক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ। ভক্তদের বিশ্বাস, তিনি অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে সন্তানদের রক্ষা করেন এবং ভয় ও অজ্ঞতা থেকে মুক্তি দেন। যেখানে দেবী লক্ষ্মী ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক, সেখানে মা কালী শক্তির রূপান্তর এবং সমস্ত অশুভ বলকে চূর্ণ করার প্রতীক। তাঁর কৃষ্ণবর্ণ, ভয়াল রূপমালা এবং খড়্গ মূলত মানুষের অহংকার, কুসংস্কার ও অধর্মকে বিনাশের বার্তা বহন করে। কার্তিক মাসের এই ঘোর অমাবস্যার অন্ধকার আসলে মানুষের ভয় ও অজানা পরিস্থিতির প্রতীক, আর দেবী কালী সেই অন্ধকার দূর করে মোক্ষ ও পরম সত্যের পথ প্রদর্শন করেন।

নিশীথ কালে কেন হয় মহাপূজা?
কালী নামের উৎস ‘কাল’ অর্থাৎ সময়। কার্তিক অমাবস্যার এই বিশেষ তিথিতে সময়ের দেবী কালীর পূজা করার পেছনে গভীর কারণ রয়েছে। সন্ধ্যা বা প্রদোষ কালে সাধারণত লক্ষ্মী পূজা হলেও, মা কালীর পূজা অনুষ্ঠিত হয় নিশীথ রাতে অর্থাৎ গভীর মধ্যরাতে। ২০২৬ সালের ৮ নভেম্বর কলকাতায় কালীপূজার নিশীথ মুহূর্ত থাকবে রাত ১০:৫৫ মিনিট থেকে রাত ১১:৪৬ মিনিট পর্যন্ত।

লক্ষ্মী পূজায় কেন এই ভিন্নতা?
বাঙালিদের ঘরেও কিন্তু দেবী লক্ষ্মীর পূজা অত্যন্ত ভক্তিভরে পালন করা হয়। তবে বাঙালির মূল লক্ষ্মী পূজা অনুষ্ঠিত হয় আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে, যা ‘কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা’ নামে খ্যাত। ওই দিন চালের গুঁড়োর আলপনা, ঘর সাজানো এবং ধন-ধান্য ও গৃহের মঙ্গল কামনায় দেবী লক্ষ্মীর আহ্বান জানানো হয়। এই আঞ্চলিক ঐতিহ্যগত কাঠামোর কারণেই দেওয়ালির দিন বাঙালিরা দেবী লক্ষ্মীর চেয়ে মা কালীর আরাধনাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ও শাক্ত ঐতিহ্যের বিকাশ:
বাংলায় কালীপূজার ব্যাপক প্রসারের পেছনে ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট তান্ত্রিক সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের অবদান অনস্বীকার্য। পরবর্তীতে রাজা এবং জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই পূজা রাজবাড়ি থেকে সাধারণ মানুষের বারোয়ারি মণ্ডপে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে করুণাময়ী ‘মা কালী’ রূপে তিনি বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নেন।

কালীপূজা মূলত মানুষকে নিজের ভেতরের ভয় ও অহংকার জয় করতে শেখায়। দীপাবলির এই আলোর উৎসবে যেমন প্রদীপের আলো চারিদিক উজ্জ্বল করে তোলে, তেমনই মা কালীর কৃপা ভক্তের অন্তর থেকে সমস্ত অন্ধকার দূর করে আত্মিক শক্তির সঞ্চার করে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *