ধনে নয়, আসল রহস্য নিহিত স্বাস্থ্যে! ধন্তেরাসে লক্ষ্মী ও ধন্বন্তরি পূজার আসল আধ্যাত্মিক তাৎপর্য কী?

সুস্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি এবং ধন-সম্পদকে ঘরে আমন্ত্রণ জানানোর এক পবিত্র উৎসব হলো ‘ধন্তেরাস’। প্রতি বছর দীপাবলির সূচনাতেই উদযাপিত হয় এই বিশেষ দিনটি। তবে কেবল সোনা-রুপো বা বাসনপত্র কেনাকাটার মধ্যেই ধন্তেরাসের তাৎপর্য সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে হিন্দু পৌরাণিক শাস্ত্রের এক গভীর আধ্যাত্মিক ইতিহাস ও ‘সমুদ্র মন্থন’-এর রোমাঞ্চকর কাহিনী।

সমুদ্র মন্থন ও ভগবান ধন্বন্তরির আবির্ভাব:
ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণ অনুযায়ী, একবার দেবতারা নিজেদের ক্ষমতা ও শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তখন ভগবান বিষ্ণুর পরম পরামর্শে দেব ও অসুররা একত্রিত হয়ে ক্ষীরসাগর বা বিশ্ব সমুদ্র মন্থন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই মহাযজ্ঞে মন্দর পর্বতকে মন্থন দণ্ড এবং নাগরাজ বাসুকীকে রজ্জু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আর মন্দর পর্বত যাতে সমুদ্রে ডুবে না যায়, তার জন্য ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং ‘কূর্ম’ (কাচ্ছপ) অবতার ধারণ করে পর্বতকে পিঠে ধারণ করেছিলেন।

সমুদ্র মন্থনের সময় এক এক করে বহু ঐশ্বরিক রত্ন উদাপিত হতে থাকে— দেবী লক্ষ্মী, কামধেনু গাভী, উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়া সহ বহু মূল্যবান জিনিস। তবে এর সাথে উঠে আসে চরম বিষাক্ত ‘হালাহল’ বিষ, যা সমগ্র সৃষ্টিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। জগৎসংসারকে রক্ষা করতে দেবাদিদেব মহাদেব সেই বিষ পান করেন এবং নিজের কণ্ঠে ধারণ করেন, যার ফলে তাঁর নাম হয় ‘নীলকণ্ঠ’।

সবশেষে, সমুদ্রের গভীর থেকে অমৃতের কলশ হাতে আবির্ভূত হন দেবতাদের স্বর্গীয় চিকিৎসক ‘ভগবান ধন্বন্তরি’।

কেন ধন্তেরাসে পূজিত হন ভগবান ধন্বন্তরি ও দেবী লক্ষ্মী?
ভগবান ধন্বন্তরি হলেন আয়ুর্বেদ ও চিকিৎসাশাস্ত্রের মূল উৎস। তাঁর হাতে থাকা অমৃত কলশ আসলে রোগমুক্তি, সুস্থতা এবং দীর্ঘায়ুর প্রতীক। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ধন্তেরাসের দিনেই তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল বলে এই দিনটিকে ‘ধন্বন্তরি জয়ন্তী’ হিসেবেও পালন করা হয়।

এর পাশাপাশি, সমুদ্র মন্থনের সময় ধনের দেবী লক্ষ্মীও আবির্ভূত হয়েছিলেন। ধন্তেরাসে একই সাথে দেবী লক্ষ্মী, ভগবান ধন্বন্তরি এবং ধন-সম্পদের রক্ষক দেব কুবেরের পূজা করা হয়।

ধন্তেরাসের আসল আধ্যাত্মিক বার্তা:
ধন্তেরাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরম স্বাস্থ্য ছাড়া বাহ্যিক ধন-সম্পদের কোনো মূল্য নেই। শরীর ও মন সুস্থ না থাকলে সমৃদ্ধি উপভোগ করা সম্ভব নয়। দেবী লক্ষ্মী যেমন আমাদের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক প্রাচুর্য প্রদান করেন, তেমনই ভগবান ধন্বন্তরি আমাদের দেন সুস্থ জীবনের বরদান। কঠিন পরিশ্রম ও সচ্ছলতার মাধ্যমে অর্জন করা সম্পদকে সঠিক পথে ব্যবহার করার এবং সুস্বাস্থ্য নিয়ে দীপাবলিকে বরণ করে নেওয়ার শুভ বার্তাই বহন করে এই ঐতিহ্যবাহী ধন্তেরাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *