জার্মানিতে ভারতীয়দের ঐতিহাসিক ‘সুপার সানডে’! একই দিনে জোড়া খেতাব জিতে ব্যাডমিন্টনে ইতিহাস গড়লেন সিন্ধু ও লক্ষ্য

বিশ্ব ব্যাডমিন্টনের আঙিনায় ভারতের জন্য রবিবাসরীয় দিনটি হয়ে থাকল এক অবিস্মরণীয় ও নিখুঁত ঐতিহাসিক মুহূর্ত। জার্মানির সারব্রুকেনে অনুষ্ঠিত হাইলো ওপেনের (Hylo Open) ফাইনালে ভারতীয় শাটলারদের জয়জয়কার। একদিকে ডেনমার্কের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী লিনে কেয়ার্সফেল্টকে স্ট্রেট গেমে উড়িয়ে দিয়ে মরশুমের দ্বিতীয় সেরা শিরোপা পকেটে পুরেছেন ডাবল অলিম্পিক পদকজয়ী পিভি সিন্ধু। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার তারকা শাটলার জোনাথন ক্রিস্টিকে উড়িয়ে দীর্ঘ এক বছরের ট্রফি-খরা কাটিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন লক্ষ্য সেন। পুরুষ ও মহিলা—উভয় সিঙ্গলসেই একই দিনে ভারতের এই জোড়া রাজত্ব আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টনে তেরঙ্গার পতাকাকে এক নতুন উচ্চতায় বসাল।
টুর্নামেন্টে একটিও গেম না হারার অবিশ্বাস্য রেকর্ড সিন্ধুর!
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই নিজের চেনা ছন্দে দাপট দেখাচ্ছিলেন ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের পোস্টার গার্ল পিভি সিন্ধু। ফাইনালেও সেই আধিপত্য বজায় রেখে ডেনমার্কের লিনে কেয়ার্সফেল্টকে মাত্র দুটি গেমে ২১-১২, ২১-১৪ ব্যবধানে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে একটিও গেম না হারার অনন্য কীর্তি গড়লেন এই ভারতীয় তারকা।
কোয়ার্টার ফাইনালে আমালি শুলজ এবং সেমিফাইনালে ভারতেরই উদীয়মান তারকা অনমোল খার্বকে কার্যত কোণঠাসা করে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছিলেন বিশ্বমানের এই তারকা। এই ট্রফি জয়ের পাশাপাশি ৯২০০ পয়েন্ট পকেটে পুরে ‘বিডব্লিউএফ ওয়ার্ল্ড ট্যুর ফাইনালস’-এর দৌড়ে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করলেন তিনি।
ট্রফি জয়ের পর নিজের কৌশল প্রসঙ্গে সিন্ধু বলেন, “প্রতিপক্ষ কে, সেটা নিয়ে ভেবে মাথা না ঘামিয়ে কোর্টে নেমে নিজের ১০০ শতাংশ দেওয়াই আমার মূল লক্ষ্য ছিল। ম্যাচের প্রথম থেকেই টানা পয়েন্টের লিড নিয়েছিলাম, যা ওকে (লিনে কেয়ার্সফেল্ট) আর ম্যাচে ফেরার কোনো সুযোগই দেয়নি।” পুরনো ফর্মে ফেরার প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে পুরো কোচিং টিমকে কুর্নিশ জানিয়ে তিনি যোগ করেন, “নতুন কৌশল কাজে এসেছে, তবে এখনও কিছু কিছু জায়গায় উন্নতির অবকাশ রয়েছে।”
জোনাথন ক্রিস্টিকে উড়িয়ে লক্ষ্যর ঐতিহাসিক খরা-মুক্তি
গত বছর নভেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতার পর দীর্ঘদিন কোনো বিডব্লিউএফ (BWF) ট্রফি অধরা ছিল ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের সেনসেশন লক্ষ্য সেনের। অবশেষে হাইলো ওপেনের মেগা ফাইনালে এক বছরের ট্রফি-খরা ঘোচালেন তিনি। ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিলেন টুর্নামেন্টের চতুর্থ বাছাই ইন্দোনেশিয়ার নামী তারকা জোনাথন ক্রিস্টি। তবে লক্ষ্যর আগ্রাসী প্লেসমেন্ট আর গতির সামনে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি ক্রিস্টি।
ফাইনালে ২১-১৭, ২১-১০ ব্যবধানে ম্যাচটি নিজের নামে করে নেন ২৫ বছর বয়সী লক্ষ্য। প্রথম গেমে একসময় ৮-৪ লিড নেওয়ার পর ক্রিস্টি ঘুরে দাঁড়িয়ে ৯-৮ গেমে এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকেই দুর্দান্ত রিফ্লেক্স, কাউন্টার স্ম্যাশ ও ডাউন-দ্য-লাইন প্লেসমেন্টে ম্যাচের রাশ নিজের হাতে তুলে নেন ভারতীয় তারকা। দ্বিতীয় গেমে ভারতীয় তারকার ক্রমাগত আক্রমণের চাপে ভুল করে বসে ম্যাচ থেকে ছিটকে যান ইন্দোনেশিয়ার প্রতিযোগী।
এই দাপুটে জয়ের ফলে ক্রিস্টির বিরুদ্ধে নিজের মুখোমুখি সাক্ষাতের হেড-টু-হেড রেকর্ড ৪-৪ সমতায় আনলেন লক্ষ্য। টুর্নামেন্টের প্রথম তিন রাউন্ডেই জোয়াকিম ওলডর্ফ, কিরণ জর্জ এবং কালে কোলজোনেনের বিরুদ্ধে ম্যারাথন থ্রিলার ম্যাচ জেতার পর সেমিফাইনালে তোমা জুনিয়র পপভকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন তিনি। শেষপর্যন্ত ফাইনালে দাপুটে জয় পেয়ে প্রথম ভারতীয় পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে জোড়া হাইলো ওপেন ট্রফি জয়ের অনন্য নজির গড়লেন তিনি। একই দিনে দুই সিঙ্গলস ক্যাটাগরিতে খেতাব জিতে ভারতীয় ক্রীড়াজগতে স্মরণীয় এক রবিবারের সাক্ষী থাকল দেশ।