কথার জাদুতে মুগ্ধ করা শাহরুখ কেন আজ দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থেকে দূরে? পর্দার আড়ালের আসল কারণ ঘিরে জল্পনা

শাহরুখ খানের নতুন কোনো ছবি মুক্তি পাবে, অথচ তাঁর সাক্ষাৎকার ঘিরে অনুরাগীদের মধ্যে উন্মাদনা থাকবে না—একসময় এমনটা ভাবাই যেত না। রূপোলি পর্দায় তাঁকে দেখার পাশাপাশি ভক্তদের চোখ থাকত তাঁর কথার জাদুর দিকেও। কখনও বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা, কখনও জীবন নিয়ে গভীর উপলব্ধি, আবার কখনও অকপট ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা—খোলামেলা কথোপকথনে তিনি বারবার বুঝিয়ে দিতেন কেন তাঁকে বলিউডের ‘বাদশা’ বলা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থেকে প্রায় সম্পূর্ণ দূরে সরে রয়েছেন শাহরুখ। তা সত্ত্বেও তাঁর জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি, বরং তাঁর এই নীরবতাই এখন নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে অনুরাগীদের মনে।
একসময় কথায় মন জয় করতেন কিং খান
শাহরুখের পুরনো সাক্ষাৎকারের ভাণ্ডার এতটাই সমৃদ্ধ যে, মেজাজ অনুযায়ী তা বেছে নেওয়ার সুযোগ আজও রয়েছে। ২০১২ সালে ‘তেহেলকা’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর চিন্তাশীল দিকটি ধরা পড়েছিল। বিখ্যাত সঞ্চালক ডেভিড লেটারম্যানের অনুষ্ঠানেও ব্যক্তিগত জীবনের নানা অজানা গল্প উঠে এসেছিল। আবার ‘কফি উইথ করণ’-এর জমকালো পর্বগুলিতে তাঁর রসবোধ ছিল দেখার মতো। ২০১৭ সালে ‘অল ইন্ডিয়া বাকচোদ’-এর পডকাস্টে তিনি যেমন ভক্তদের হাসিয়েছেন, তেমনই আবার কথার ফাঁকে গভীর ভাবনার খোরাক জুগিয়েছেন।
বিশিষ্ট সাংবাদিক অনুপমা চোপড়ার স্মৃতিতেও শাহরুখের এই সহজাত রসবোধ অত্যন্ত স্পষ্ট। ‘রাম জানে’ ছবির শুটিংয়ের সময় প্রথম সাক্ষাৎকার নেওয়ার মুহূর্ত থেকেই অভিনেতার বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। এমনকি ‘জব হ্যারি মেট সেজল’ ছবির প্রচারে অভিনেত্রী অনুষ্কা শর্মার সঙ্গে সাক্ষাৎকার চলাকালীন হঠাৎ একটি কুকুরের ডাক শুনে শাহরুখ নিজেও মজার ছলে কুকুরের মতো ডেকে ওঠেন! এমন ছোট ছোট স্বতঃস্ফূর্ত মুহূর্তই তাঁর সাক্ষাৎকারকে বাকিদের থেকে আলাদা করে তুলত।
কেন হঠাৎ সাক্ষাৎকার থেকে দূরে সরে গেলেন অভিনেতা?
বিনোদন সাংবাদিক মহরের বসুর মতে, বর্তমান সময়ে শাহরুখের মতো মেগাস্টারের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের অভাব দারুণভাবে অনুভূত হয়। তবে অভিনেতার এই দূরত্বের নেপথ্যে রয়েছে বদলে যাওয়া প্রচারব্যবস্থাও। জনসংযোগ সংস্থার কড়া নিয়ন্ত্রণ, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিটি কথার কাটাছেঁড়া এবং মুহূর্তের মধ্যে তা ভাইরাল করে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক তারকাই এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক ও রক্ষণশীল।
২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক স্তরে শাহরুখের প্রচারের দায়িত্ব সামলানো মান্দভি শর্মার মতে, একসময় কথোপকথনের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আসল গল্প ও জার্নি জানা। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই প্রাধান্য পাচ্ছে চটকদার শিরোনাম ও বেশি ভিউ বা দর্শক টানার ইঁদুরদৌড়। ফলে গভীর ও অর্থবহ আলোচনার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
সোশ্যাল মিডিয়া কি তবে নতুন মাধ্যম?
শাহরুখ অবশ্য ভক্তদের সঙ্গে সংযোগ পুরোপুরি ছিন্ন করেননি। এক্স (সাবেক টুইটার)-এ তাঁর জনপ্রিয় ‘আস্ক এসআরকে’ (#AskSRK) পর্বে তিনি সরাসরি অনুরাগীদের বিভিন্ন প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত অথচ মজাদার উত্তর দেন। চলচ্চিত্রকার নাসরিন মুন্নি কবিরের মতে, আজকের দিনে মানুষ শুধু তারকার দীর্ঘ জীবনকাহিনি জানতে চায় না, তারা জানতে চায় তারকা ঠিক কয়েক মিনিট আগে কী করছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়া সেই তাৎক্ষণিক যোগাযোগের পথ খুলে দিয়েছে। অমিতাভ বচ্চনও নিয়মিত ব্লগের মাধ্যমে ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। অর্থাৎ, তারকা ও দর্শকের যোগাযোগের ধরন অনেকটাই বদলে গেছে।
তবে শাহরুখের ক্ষেত্রে একটা মৌলিক পার্থক্য থেকে যায়—বহু বছরের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের চিন্তা, স্মৃতি, মতামত ও অভিজ্ঞতার যে জগৎ তৈরি করেছিলেন, তা এক দিনে গড়ে ওঠেনি।
আবার কি ফিরবেন দীর্ঘ কথোপকথনে?
শাহরুখ নিজেই একসময় মন্তব্য করেছিলেন যে, তাঁর নতুন করে বলার মতো আর বিশেষ কিছু নেই। কিন্তু ভক্ত ও সাংবাদিকদের আশা, তিনি হয়তো ফের কোনো দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ফিরবেন। মহরের কথায়, ‘আস্ক এসআরকে’-র ছোট ছোট টুইট বা উত্তর কখনোই প্রাণখোলা দীর্ঘ কথোপকথনের বিকল্প হতে পারে না। অনুপমা চোপড়াও পেশাগত জীবন শেষ করার আগে অভিনেতার আরও একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।
শাহরুখ খানের এই অনুপস্থিতি তাই নিছক কোনো তারকার নীরবতা নয়, বরং সাংবাদিকতার এক বিশেষ ও সমৃদ্ধ ধারা হারিয়ে যাওয়ার আক্ষেপও বটে। বহু বছর ধরে নিজের কথার জাদুতে যে আত্মিক সম্পর্ক তিনি গড়ে তুলেছেন, তার জোরেই আজও কোনো সাক্ষাৎকার না দিয়েও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বলিউডের অবিসংবাদিত বাদশা।