বেতন বৃদ্ধির মুখে বড় ধাক্কা? রাজ্যের ১০ হাজার বৃত্তিমূলক শিক্ষকের সার্টিফিকেট যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নবান্নের!

রাজ্যের প্রায় ১০ হাজার বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল খবর। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়সের শংসাপত্র-সহ একাধিক জরুরি নথি পুনর্যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার (West Bengal Government)। দীর্ঘদিন ধরেই চুক্তিভিত্তিক এই শিক্ষকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। এবার নবান্ন সূত্রে খবর, এই সমস্ত নথি নিখুঁতভাবে যাচাই প্রক্রিয়ার পরই বেতন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হতে পারে। আগামী ২০ নভেম্বর থেকে রাজ্যজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে এই বিশাল উদ্যোগ।
কীভাবে সম্পন্ন হবে সার্টিফিকেট যাচাই প্রক্রিয়া?
কারিগরি শিক্ষা দপ্তরের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হবে দুটি ধাপে:
অনলাইন আপলোড: প্রথমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের সমস্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়সের মূল সার্টিফিকেট একটি নির্দিষ্ট অনলাইন পোর্টালে আপলোড করতে হবে।
সশরীরে ভেরিফিকেশন: অনলাইন প্রক্রিয়ার পর আসল নথিপত্র নিয়ে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে হাজির হয়ে সেগুলি যাচাই বা ভেরিফিকেশন করাতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কোন কেন্দ্রে যাবেন, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে।
রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি পলিটেকনিক কলেজগুলিতে আগামী ২০ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত লাগাতার এই নথি যাচাইয়ের কাজ চলবে।
স্বল্প বেতন ও অতীতের নিয়োগ বিতর্ক
বর্তমানে রাজ্যে এই ধরণের বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২,৭০০। যেখানে অষ্টম শ্রেণি পাশ শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে বৃত্তিমূলক পঠনপাঠন চালানো হয়। চুক্তিভিত্তিতে নিযুক্ত শিক্ষক ও প্রশিক্ষকরাই মূল পঠনপাঠনের স্তম্ভ।
অনেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, ইঞ্জিনিয়ারিং বা কৃষিবিজ্ঞানের উচ্চ ডিগ্রিধারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মাসিক বেতন মাত্র ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিক্ষাক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক অন্যান্য কর্মচারী ও শিক্ষাকর্মীদের বেতন সম্প্রতি বাড়লেও, বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এখনও সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
তবে এই ভেরিফিকেশনের নেপথ্যে রয়েছে অতীত নিয়োগের একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। শিক্ষক সংগঠন ও কারিগরি শিক্ষা দপ্তর সূত্রে খবর, অতীতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে বেশ কিছু গলদ থেকে গিয়েছিল।
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ২০০৪-০৫ সাল নাগাদ যখন এই নিয়োগগুলি করা হয়, তখন স্বল্পমেয়াদি কোর্সের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল উচ্চ মাধ্যমিক ও এনসিভিটি (NCVT) স্বীকৃত শংসাপত্র। অন্যদিকে, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির জন্য প্রয়োজন ছিল অনার্সসহ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।
কারা রয়েছেন স্ক্যানারে? কী হতে পারে ভবিষ্যৎ?
অভিযোগ উঠেছে, সেই সময় নিয়ম শিথিল করে মাধ্যমিক পাশ বা অস্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের শংসাপত্রধারীদেরও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল। এমনকি শিক্ষক পদে স্রেফ ডিপ্লোমাধারীদেরও স্থান দেওয়া হয়। বিশেষ সূত্রের দাবি, বর্তমানে কর্মরত প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার শিক্ষক-প্রশিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতায় বড় ধরনের ঘাটতি বা অমিল রয়েছে।
নতুন করে এই ভেরিফিকেশনে যাঁদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা বা বৈধ কাগজপত্র মিলবে না, তাঁদের চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে নবান্ন। সব মিলিয়ে, নথি যাচাইয়ের এই পদক্ষেপে যেমন বেতন বৃদ্ধির আলো দেখছেন যোগ্য শিক্ষকরা, তেমনই যোগ্যতা নিয়ে জল্পনায় আতঙ্কে দিন গুনছেন একটি বড় অংশ।