পুজো শেষ হলেও ভাঙল না মণ্ডপ! ঘুঘুর ছানাকে বাঁচাতে চুঁচুড়ার ক্লাবের যে মানবিক রূপ ভাইরাল, তা দেখলে মন জুড়িয়ে যাবে

দুর্গাপুজো শেষ মানেই এখন শহরজুড়ে মণ্ডপ খোলার তোড়জোড়। কিন্তু চলতি মরশুমে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে এক অভাবনীয় ও মন ভালো করা মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল হুগলির চুঁচুড়ার সুকান্তনগরের ‘সুকান্ত স্মৃতি সঙ্ঘ’। মণ্ডপ ভাঙার আগেই সেখানে ঘুঘু পাখির বাসা এবং সদ্যোজাত ছানা দেখতে পাওয়ায়, পাখির নিরাপত্তার কথা ভেবে পূজামণ্ডপ ভাঙার কাজ স্থগিত রেখেছেন ক্লাবের সদস্যরা। ছানাগুলো বড় হয়ে নিজে উড়ে যাওয়ার শক্তি অর্জন না করা পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত থেকে তারা সরবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। আর তাদের এই পশুপ্রেত ও দয়ালু উদ্যোগ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় সজোরে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে। কীভাবে শুরু এই ঘটনার?
এ বছর ৫৩ বছরে পদার্পণ করেছে সুকান্ত স্মৃতি সঙ্ঘের দুর্গোৎসব। সাঁচি স্তূপের আদলে গড়া এই মণ্ডপের সমস্ত কারুকার্য ক্লাবের সদস্যরাই নিজেদের হাতে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই মণ্ডপের বাঁশের কাঠামোয় দুটি ঘুঘু পাখি বাসা বাঁধতে শুরু করে। মণ্ডপের দুই প্রান্তে খড়কুটো দিয়ে তৈরি হয় নিরাপদ আশ্রয়। পরবর্তী সময়ে সিলিং বা ছাদ তৈরির কাজ চলাকালীন দেখা যায়, ওই দুটি বাসায় মোট চারটি ডিম রয়েছে। পাখিদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে উদ্যোক্তারা সিলিংয়ে সাধারণত ব্যবহৃত তাঁবু বা ত্রিপল টানানোর সিদ্ধান্ত তৎক্ষণাৎ বাতিল করেন। তার পরিবর্তে বাসার ঠিক ওপরে কেবল একটি পাতলা কাপড় টাঙিয়ে দেওয়া হয়, যাতে আলো-বাতাসের কোনো সমস্যা না হয়। ঝড়-জল উপেক্ষা করে অটুট মায়ার বন্ধন
এরই মধ্যে বাংলায় হানা দিয়েছিল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। হুগলি জেলায় তার সরাসরি বড় কোনো প্রভাব না পড়লেও ঝড়-বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়ার দাপট বজায় ছিল। কিন্তু প্রকৃতির সেই প্রতিকূলতাও ঘুঘু দম্পতিকে তাদের বাসা বা ছানা ছেড়ে নড়াতে পারেনি। ক্লাবের সদস্যরা নিয়মিত মণ্ডপের সিলিংয়ে উঁকি দিয়ে পাখির খবর রাখতেন। ইতিমধ্যেই একটি ঘুঘু তার বড় হওয়া ছানাকে নিয়ে অন্যত্রে উড়ে গেলেও, অন্য বাসাটিতে এখনও একটি ছোট্ট ছানা রয়েছে। ছানাটির গায়ে সদ্য পালক গজাতে শুরু করেছে। তবে নির্দিষ্ট করে কবে তার জন্ম হয়েছিল, তা বলতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। পুজো কমিটির সহকারী সম্পাদক প্রণব পাল এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, “আমরা মানুষ, ওরাও তো এই পৃথিবীরই জীব। ওদেরও বাঁচার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। ডিম ফুটে বাচ্চাগুলো বড় হয়ে নিজে উড়ে না শেখা পর্যন্ত আমরা এই মণ্ডপ ভাঙব না।” যেহেতু মণ্ডপটি জিটি রোডের পাশেই অবস্থিত, তাই আপাতত রাস্তার ধারের অপ্রয়োজনীয় কিছু অংশ খোলা হলেও মূল ছাদ বা কাঠামো যেমন আছে তেমনই রাখা হয়েছে। ছানাটি উড়তে সক্ষম হলেই বাকি কাজ শুরু হবে। স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের সাধুবাদ ও বড় প্রাপ্তি
আলো ঝলমলে মেগা সেট বা জমকালো পুজোর থিম নয়, বরং ছোট্ট একটা ঘুঘুর ছানাকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে চুঁচুড়ার এই ক্লাব প্রমাণ করে দিয়েছে যে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি প্রকৃতি ও প্রাণীদের রক্ষা করাও মানুষের সমান নৈতিক দায়িত্ব। ক্লাবের এই প্রশংসনীয় মানবিক উদ্যোগ নজর এড়ায়নি তারকা মহলেরও। বিশিষ্ট অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় এই খবরটি শেয়ার করে নিজের ফেসবুক হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “চাইলেই পারা যায়, দেখুন শিখুন। একেই বলে মানুষ হওয়া।” জাতীয় স্তরের অভিনেত্রীর কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়ায় আপ্লুত ক্লাব সদস্যরাও। তাঁদের মতে, এই ভালোবাসা ও সম্মানই আগামী দিনে তাঁদের আরও ভালো ও সমাজমুখী কাজ করার অন্তহীন অনুপ্রেরণা জোগাবে।