“ভারতের হাতে করিডর তুলে দিলে আগুন জ্বলবে!” তারেককে সরাসরি তোপ নাহিদের, গঙ্গা চুক্তি নিয়েও বাংলাদেশ উত্তাল

বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী হাওয়া ফের তীব্র আকার নিতে শুরু করেছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিরোধী দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP)-র শীর্ষনেতা নাহিদ ইসলাম এক বিস্ফোরক বিবৃতিতে সরকার ও দিল্লির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা— বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতকে কোনো ধরনের ট্রানজিট করিডর দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেন ঢাকা একতরফাভাবে না নেয়। একই সঙ্গে আসন্ন গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির পুনর্নবীকরণ ইস্যুতেও দেশব্যাপী বড় ধরনের আন্দোলনের হুমকি দিয়ে রাখলেন তিনি।
ট্রানজিট করিডর ঘিরে সরকারের বিরুদ্ধে তোপ
ঢাকার এক জনসভায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে ভারতকে অবৈধভাবে ট্রানজিট করিডর দেওয়ার চক্রান্তের অভিযোগ তোলেন নাহিদ। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো এবং বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, জাপান ফের বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে একটি আঞ্চলিক যোগাযোগ বা করিডর তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। নাহিদের দাবি, সেই করিডরকে ভারতের ব্যবহারের জন্য সঁপে দেওয়ার চক্রান্ত করছে বিএনপি সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে নাহিদ কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই এই ধরনের অবৈধ করিডর মানবে না।
বিতর্কের নেপথ্যে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফর
নাহিদের এই কঠোর মনোভাবের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের জাপান সফর। টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকালে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডিয়ান গ্রোথ বেল্ট’ বা বঙ্গোপসাগরীয় শিল্পোন্নয়ন বলয়কে আরও সম্প্রসারিত করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়।
এছাড়া, জাপানের উন্নয়ন সংস্থা ‘জাইকা’ (JICA)-র অর্থায়নে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নির্মিত মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগের পরিকল্পনাও রয়েছে। জাপানের প্রাথমিক ছক অনুযায়ী, এই পোর্ট ও ট্রানজিট রুটের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির (North-East India) সঙ্গে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি বাণিজ্যিক শৃঙ্খল তৈরি হতে পারে।
তবে বিরোধীদলের এই ট্রানজিট বিতর্কের দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “জাপান সফরে কোনো তৃতীয় দেশকে নিয়ে আলোচনা হয়নি। বৈঠকের ফোকাস ছিল কেবলই বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব।”
অন্যদিকে, ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালও জানান, জাপানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়নে জাপানের যৌথ প্রকল্পগুলিকে দিল্লি আরও জোরদার করতে বদ্ধপরিকর।
ফরাক্কা ও গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি: ‘এক বিন্দুও ছাড় নয়’
ট্রানজিট বিতর্কের পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি ‘গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি’ নিয়েও কড়া অবস্থান নিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে চলেছে এই ঐতিহাসিক চুক্তির মেয়াদ। জানুয়ারি থেকে মে মাসের শুষ্ক মরসুমে ফরাক্কা ব্যারেজ থেকে গঙ্গার জলের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করাই এখন ঢাকার বড় চ্যালেঞ্জ।
নাহিদ ইসলামের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি— নতুন বা সংশোধিত চুক্তিতে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত না করা হলে সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর দল ফের রাজপথে নামবে। বিডিনিউজ২৪-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ফরাক্কার জলে বাংলাদেশের অধিকার রক্ষা করতে এবার এক বিন্দুও ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ভারত সরকার ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গাসহ সমস্ত নদীর জলবণ্টন সংক্রান্ত যেকোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যৌথ নদী কমিশনের (Joint Rivers Commission) মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়ে আসছে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পারদ যেভাবে চড়ছে, তাতে আগামী দিনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের জল কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই তাকিয়ে আন্তর্জাতিক মহল।