‘সেক্স মন্ত্রক’ তৈরির আজব প্রস্তাব ঘিরে আর্মেনিয়ার সংসদে তুলকালাম! স্পিকারের চেয়ার ছোঁড়াছুড়ি থেকে লাথি-ঘুষি, ভিডিও ভাইরাল!

সংসদের পবিত্র চত্বর পরিণত হলো যেন এক রক্তক্ষয়ী রিংয়ে! ‘সেক্স মন্ত্রক’ (Ministry of Sex) নামক এক অদ্ভুত কাল্পনিক প্রস্তাব এবং কয়েক মাস আগের একটি পুরোনো মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রীতিমতো রণক্ষেত্র হয়ে উঠল আর্মেনিয়ার সংসদ। শাসক ও বিরোধী দলের সাংসদদের মধ্যে তুমুল বাগ্‌বিতণ্ডা থেকে শুরু হওয়া এই বিবাদ মুহূর্তের মধ্যে নজিরবিহীন হাতাহাতিতে রূপ নেয়। সংসদের অন্দরে চলে দেদার লাথি-ঘুষি, জামাকাপড় ছঁড়ে ফেলা থেকে শুরু করে ডেপুটি স্পিকারকে পর্যন্ত বিরোধীদের দিকে চেয়ার ছুড়তে দেখা যায়! এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আর্মেনিয়া সংসদে এমন বর্বরোচিত হিংসার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

কী এই ‘সেক্স মন্ত্রক’-এর আসল বিতর্ক?

পুরো ঘটনাটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল তৈরি হলেও প্রথমেই স্পষ্ট করে রাখা ভালো যে, আর্মেনিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সেক্স মন্ত্রক’ তৈরির কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি এবং সংসদেও এমন কোনো বিল পেশ করা হয়নি।

এই চরম উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটি বিতর্কিত পডকাস্ট থেকে:

  • জনসংখ্যা সংকট ও বিতর্ক: আর্মেনিয়ার বিরোধী দল ‘স্ট্রং আর্মেনিয়া’-র সঙ্গে যুক্ত সার্গিস কারাপেতিয়ান দেশের ক্রমাগত কমে যাওয়া জনসংখ্যা এবং নিম্ন জন্মহার সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সেই কথোপকথনের মাঝেই এক অংশগ্রহণকারী কাল্পনিকভাবে একটি ‘মিনিস্ট্রি অফ সেক্স’ বা সেক্স মন্ত্রক গঠনের কথা উত্থাপন করেন। সার্গিস তখন মন্তব্য করেছিলেন যে, প্রথাগত উপায়ের বাইরে গিয়ে দেশের জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলা করা দরকার।

  • মহিলাদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য: ওই পডকাস্টে মহিলাদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিয়েও কিছু বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়, যা পরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। যদিও সার্গিসের দাবি ছিল, তাঁর বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা করে প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

কেন হঠাৎ কয়েক মাস পর সংসদে হাতাহাতি?

পডকাস্টের সেই পুরোনো ঘটনা আচমকাই গত ২৯ অক্টোবর আর্মেনিয়ার সংসদে নতুন করে বিস্ফোরণ ঘটায়। ওই দিন সংসদে অডিট চেম্বারের সদস্য নিয়োগ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল। সেই সুযোগেই শাসকদল সিভিল কনট্র্যাক্টের সাংসদ তারোন চাকোইয়ান হঠাৎই সেই পুরোনো পডকাস্টের প্রসঙ্গ টেনে আনেন এবং বিরোধী নেতা তথা সার্গিস কারাপেতিয়ানের তুতো ভাই নারেক কারাপেতিয়ানকে মহিলাদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।

তারোন চাকোইয়ানের এই দাবির তীব্র প্রতিবাদের মুখে পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতের বাইরে চলে যায়। নারেক পাল্টা জবাব দিতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল কথাকাটাকাটি শুরু হয়, যা নিমেষেই হিংসাত্মক রূপ নেয়।

সংসদের অন্দরে রক্তারক্তি ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির রোমহর্ষক দৃশ্য

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বচসা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুই পক্ষের উগ্র সাংসদরা একে অপরের দিকে তেড়ে যান।

  • লাথি-ঘুষি ও রক্তপাত: সংসদের মেঝেতে শুরু হয় চুলোচুলি, ধাক্কাধাক্কি, এলোপাথাড়ি ঘুষি ও লাথি। এই হাতাহাতির চোটে একাধিক সাংসদ মারাত্মকভাবে আহত হন—কারও নাক দিয়ে রক্ত গড়ায়, আবার কারও গায়ে থাকা জামাকাপড় পর্যন্ত ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

  • ডেপুটি স্পিকারের কাণ্ড: পরিস্থিতি আরও অদ্ভুত মোড় নেয় যখন সংসদের ডেপুটি স্পিকার ভাগন আলেক্সানিয়ানকে পর্যন্ত নিজের আসন ছেড়ে বিরোধী সাংসদদের লক্ষ্য করে পরপর চেয়ার ছুড়তে দেখা যায়! শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং বাধ্য হয়ে সংসদের অধিবেশন মুলতুবি করা হয়।

‘সাংসদদের মারামারি একদম ঠিক আছে!’—বিস্ফোরক প্রধানমন্ত্রী

সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংসদের অন্দরে এমন নজিরবিহীন তাণ্ডবের পরও ঘটনার তীব্র নিন্দা করার পরিবর্তে শাসকদলের সাংসদদের এই মারমুখী পদক্ষেপকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন খোদ আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান।

তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বিরোধী দলে থাকলেই কেউ যা খুশি তাই বলে পার পেয়ে যাবেন, তা হতে পারে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী শারীরিক প্রতিরোধ বা চেয়ার-সমেত আক্রমণ করাও সম্পূর্ণ ন্যায্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে, বিরোধী নেতা নারেক কারাপেতিয়ানও সংসদের অন্দরের এই হাতাহাতিকে ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ বলে দাবি করেছেন। সবমিলিয়ে, এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আর্মেনিয়া সংসদে তৃতীয়বারের মতো এই ধরনের মারামারির ঘটনা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *