‘প্রেম ভেঙে গেলেই কেন ধর্ষণের কেস?’ লিভ-ইন ও শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে ঐতিহাসিক প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের!

সম্পর্কে থাকা অবস্থায় যা স্বাভাবিক ও পারস্পরিক সম্মতিক্রমে ঘটে, সেই একই বিষয় সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেই কেন ‘ধর্ষণ’ বা অপরাধের তকমা পাবে? প্রেম ভাঙার পর পুরনো সম্পর্ককে আইনি মারপ্যাঁচে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে এবার তীব্র প্রশ্ন তুলল দেশের শীর্ষ আদালত (Supreme Court)।
সম্প্রতি একটি ধর্ষণের অভিযোগ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে বিচারপতি বিভি নাগরত্না এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ এই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।
কেরল হাইকোর্টের রায় খারিজ ও ব্যক্তির অব্যাহতি
কেরলের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর ওঠা ধর্ষণ ও প্রতারণার অভিযোগ থেকে তাঁকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি (Quash) দিয়ে এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। পূর্বে কেরল হাইকোর্ট ওই ব্যক্তির আর্জি খারিজ করেছিল। পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন।
মামলার পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে, যদি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজেদের ইচ্ছে ও সম্মতিক্রমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, পরবর্তীতে কোনো কারণে সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে আগের সম্পর্কটিকে আইনিভাবে ‘ধর্ষণ’ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য কখনোই এমন ছিল না।
‘অনুশোচনা আর অপরাধ এক নয়’
আদালত উল্লেখ করে, দীর্ঘদিনের একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর কোনো ব্যক্তির অতীত সিদ্ধান্ত নিয়ে মনের ভেতর অনুতাপ বা অনুশোচনা তৈরি হতেই পারে, তবে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। কিন্তু অতীতের সেই সম্মতিমূলক সম্পর্ককে পরবর্তীতে হুট করে অপরাধ বা ‘ধর্ষণ’ বলে চিহ্নিত করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়।
‘পুরুষের কি ব্রেক-আপ করার বা সম্পর্ক শেষ করার অধিকার নেই?’
শুনানি চলাকালীন বেঞ্চ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর প্রশ্ন তোলে— একজন পুরুষকে কি তাঁর নিজের জীবন, অনুভূতি ও সম্পর্কের বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত রাখা যায়?
বিচারপতিদ্বয় মন্তব্য করেন, যদি কোনো ব্যক্তির মনে প্রতিনিয়ত এই মানসিক ভয় কাজ করে যে, প্রেম বা সম্পর্ক শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মতো মিথ্যা আইনি কেস দেওয়া হবে, তবে কেবল সেই ভয়ের আইনি চাপে পড়েই তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটি ‘মৃত সম্পর্ক’ টেনে নিয়ে যেতে বাধ্য হবেন।
গুরুতর অপরাধের অপব্যবহার রোধে কড়া বার্তা
শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ আক্ষেপ প্রকাশ করে জানায়, আজকাল বহু মামলায় দেখা যাচ্ছে যে দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা কিন্তু পরবর্তীতে ব্যর্থ হওয়া সম্পর্কগুলিকে খুব সহজেই ‘ধর্ষণের মামলায়’ রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট কড়া ভাষায় মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ‘ধর্ষণ’ একটি অত্যন্ত জঘন্য ও গুরুতর সামাজিক অপরাধ। এর প্রয়োগ কেবল তখনই হওয়া উচিত যখন বাস্তবে জোর খাটিয়ে, হিংসা প্রদর্শন করে কিংবা বিবাহের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে শীর্ষ আদালত আমাদের সামাজিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বলেছে, আজও সমাজের একটা বিরাট অংশে প্রকৃত ধর্ষণের বহু ঘটনা নথিভুক্তই হয় না। বহু নির্যাতিতা নারী সমাজ ও পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে চুপ করে থাকেন। তাই এই ধরনের গুরুতর আইনের অপব্যবহার রোধ করা অত্যন্ত জরুরি।