পশ্চিমী কূটনীতি ও তেল বাণিজ্যে দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে জি২০-র মঞ্চে গর্জে উঠলেন জয়শঙ্কর! কড়া বার্তা দিল ভারত

বিশ্বজুড়ে তেল এবং শক্তি সম্পদের সরবরাহে নানা ধরণের নিষেধাজ্ঞা ও কৃত্রিম বাধা সৃষ্টির বিরুদ্ধে এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিল ভারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় আয়োজিত জি২০ (G20) বিদেশমন্ত্রীদের হাই-প্রোফাইল বৈঠকে পশ্চিমী দেশগুলিকে সোজা ভাষায় কড়া বার্তা দিয়েছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি সাফ জানান, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে পশ্চিমের একাধিক শক্তিধর দেশ জ্বালানি বাজারে ইচ্ছামতো নিষেধাজ্ঞা চাপাচ্ছে, যার ফলে চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলিকে।

শুক্রবার জি২০ মঞ্চে জয়শঙ্কর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “জ্বালানি বাণিজ্য এবং পরিকাঠামোর ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ আসলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করার এক সুপরিকল্পিত চাল।”

মার্কিন বিদেশসচিবের সামনেই তোপ
মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ইরান থেকে তেল বিক্রির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধকালীন অস্থিরতা এবং রাশিয়ার ডিজেল বিক্রির ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ সবিস্তারে উঠে আসে। সেই প্রেক্ষাপটেই ভারতের সার্বভৌম ও দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেন বিদেশমন্ত্রী। জয়শঙ্কর সরাসরি পশ্চিমী দেশগুলির নীতিকে দ্বিচারিতার রূপ বলে আখ্যা দেন।

বৈঠকের পর সমাজমাধ্যম ‘এক্স’ (X)-এ একটি পোস্টে ভারতের বিদেশমন্ত্রী লেখেন, “বিশ্ববাজারকে উন্মুক্ত এবং অনুমানযোগ্য রাখতে জি২০ রাষ্ট্রগোষ্ঠীকে সহানুভূতিশীল মানসিকতা নিয়ে এগোতে হবে। বর্তমান শক্তি সংকট কিন্তু উৎপাদনের অভাবের জন্য তৈরি হয়নি; তৈরি হয়েছে কৃত্রিম নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহ লাইনে বাধা এবং ভৌগোলিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে।”

দরিদ্র দেশগুলির দুর্দশা নিয়ে হেলদোল নেই উন্নত বিশ্বের
পশ্চিমের বিশ্বনীতিকে তীব্র আক্রমণ করে জয়শঙ্কর যোগ করেন, নিজেদের সুবিধামতো কোন ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে আর কোন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা চাপানো হবে— সেই দ্বিমুখী সিদ্ধান্ত দেখলেই মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়। কৃত্রিম বাধার কারণে নিম্ন-আয়ের দেশগুলি যে কী পরিমাণ ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তা নিয়ে উন্নত বিশ্বের কোনো মাথাব্যথাই নেই। জয়শঙ্কর মনে করিয়ে দেন, আজকের বিশ্বে এক প্রান্তের জ্বালানি সংকটের প্রভাব অন্য প্রান্তেও পড়তে বাধ্য, কারণ প্রতিটি দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।

ভারতের এলপিজি চাহিদা ও গ্রিন অ্যানার্জির প্রস্তাব
ভারতের বিপুল অভ্যন্তরীণ চাহিদার কথা তুলে ধরে বিদেশমন্ত্রী জানান, দেশের কোটি কোটি পরিবারের রান্নাঘরের জন্য ভারতের নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য এলপিজি (LPG) সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি খনিজ খাতের সুরক্ষায় ভারতের ‘ন্যাশনাল মিশন অন ক্রিটিক্যাল মিনারেলস’-এর রূপরেখা তুলে ধরে তিনি জি২০ মঞ্চে ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস সার্কুলারিটি ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রস্তাব দেন। একই সাথে গ্রিন হাইড্রোজেন, বায়ো-ফুয়েল ও ক্ষুদ্র মডুলার রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

সংঘাতময় বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা (UNCLOS) রক্ষা এবং ভারতীয় নাবিকদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন জয়শঙ্কর। রাশিয়া-ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিরসনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে কূটনীতি ও আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার জোরালো বার্তা দিয়ে ভাষণ শেষ করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *