মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করা সঠিক? তালিবানের সমর্থনে জাকির নায়েকের মন্তব্যে বিশ্বজুড়ে তুলকালাম!

আফগানিস্তানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বন্ধ রাখার তালিবানি সিদ্ধান্তকে কার্যত সমর্থন করে চরম বিতর্কের মুখে পড়লেন ভারতের পলাতক বিতর্কিত ইসলামিক প্রচারক জাকির নায়েক। তাঁর সাম্প্রতিক এক ভিডিও মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই সহ বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব জাকির নায়েকের এই যুক্তির বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনায় মুখর হয়েছেন।
কী সাফাই দিয়েছেন জাকির নায়েক?
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে জাকির নায়েক দাবি করেন, তালিবান নাকি আফগানিস্তানে মেয়েদের পড়াশোনা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তাঁর যুক্তি, “নি নিরাপত্তাজনিত সমস্যা এবং মহিলা শিক্ষকের চরম অভাবের কারণেই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন যে, আফগানিস্তানে মেয়েরা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারছে এবং পরবর্তীতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই ওপরের ক্লাসের পড়াশোনা চালু করবে তালিবান। এমনকি আফগান মহিলারা ইসলামিক স্টাডিজ, শরিয়া, আরবি এবং কোরান নিয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি করার সুযোগ পাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের খবরকে ‘ভুল’ আখ্যা দিয়ে জাকির নায়েক জানান, তিনি নিজে তালিবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেই এই তথ্য পেয়েছেন।
জাকির নায়েকের দাবি বনাম রাষ্ট্রসংঘের তথ্য
তবে জাকির নায়েকের এই গোলাপি ছবির সঙ্গে রাষ্ট্রসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির আসল পরিসংখ্যানে বিশাল ফারাক দেখা গেছে।
ইউনেস্কো ও ইউনিসেফ (UNICEF)-এর রিপোর্ট: ২০২১ সালের ১৫ অগস্ট তালিবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রায় ২৬ লক্ষেরও বেশি আফগান মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।
সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা: ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে মহিলাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
চিকিৎসা শিক্ষাতেও কোপ: ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারির মতো জরুরি চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানেও মহিলাদের পড়াশোনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে তালিবান।
বর্তমানে আফগানিস্তানই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে নারীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নেওয়ার অধিকার আইন করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
‘মহিলা শিক্ষক আসবে কোথা থেকে?’— তোপ মালালার বাবার ও আফগান বুদ্ধিজীবীদের
জাকির নায়েকের এমন সাফাইয়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন নোবেলজয়ী মালালার বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই। তিনি বলেন, “অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষা বন্ধ রাখা কোনো ‘সাময়িক স্থগিতাদেশ’ হতে পারে না। মহিলা শিক্ষকের অভাবের অজুহাত দিয়ে মেয়েদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার তালিবানি চক্রান্তকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন জাকির নায়েক।”
একই সুর ফুটে উঠেছে আফগানিস্তানের সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের মুখেও। আফগান ইন্টারন্যাশনাল পশতোর সম্পাদক মাহবুব শাহ মাহবুব ও সাবেক আফগান সাংসদ মারিয়াম সোলাইমানখিল সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন— “মেয়েরা যদি স্কুলে বা কলেজে পড়তেই না পারে, তবে ভবিষ্যতে নতুন মহিলা শিক্ষক তৈরি হবে কীভাবে? এই অযৌক্তিক অজুহাত দেখিয়ে আসল সত্য ঢাকা যাবে না।”
মালয়েশিয়ার ভূমিকা নিয়ে ফের প্রশ্ন
এই বিতর্কের মাঝেই জাকির নায়েককে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে মালয়েশিয়ার সরকারের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতীয় ইতিহাসবিদ এস ইরফান হাবিব ও স্কলার এ ফাইজুর রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে ট্যাগ করে প্রশ্ন তুলেছেন, চরমপন্থী চিন্তাধারাকে সমর্থন করা একজন ব্যক্তির প্রতি মালয়েশিয়া প্রশাসনের এত সহানুভূতি কেন?
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে ভারত ছাড়ার পর ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পান জাকির নায়েক। ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অর্থপাচার ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর মামলা থাকলেও, তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার ভারতীয় প্রচেষ্টা এখনও সফল হয়নি।