প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনেও মরলেন না মহিলা কয়েদি! মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে প্রথম মুখ খুললেন ক্রিস্টা পাইক!

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখ থেকে অদ্ভুতভাবে ফিরে এসেছেন তিনি। তবে প্রাণে বাঁচলেও অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে এখনও মুক্তি পাননি আমেরিকার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ক্রিস্টা পাইক। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সেই ব্যর্থ চেষ্টার ঠিক প্রায় এক মাস পর এই প্রথম প্রকাশ্যে মুখ খুললেন ৫০ বছর বয়সি এই মহিলা। তাঁর কথায়, শরীরের প্রতিটি অংশে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে এবং শুধু শারীরিক নয়, মনের গভীরেও জমে রয়েছে গভীর ক্ষত।
কী ঘটেছিল সেই রাতে?
গত ৩০ সেপ্টেম্বর টেনেসি প্রদেশে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন দিয়ে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া পুরোপুরি সফল হয়নি। বরং গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। কয়েকদিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর তাঁর জ্ঞান ফেরে।
আইনজীবীদের মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে ক্রিস্টা জানিয়েছেন, সেই ভীতিপ্রদ রাতের পর থেকে এমন একটি মুহূর্তও যায়নি যখন তিনি যন্ত্রণামুক্ত ছিলেন। তাঁর হাত, বাহু, শরীর এবং গলায় প্রচণ্ড ব্যথা রয়েছে। এখনও ঠিকমতো কথা বলতেও সমস্যা হচ্ছে তাঁর। ক্রিস্টার স্পষ্ট কথা, এই যন্ত্রণা শুধু তাঁর শরীরকে গ্রাস করেনি, বরং তাঁর মন এবং আত্মাকেও গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে।
ঘটনার নেপথ্য ইতিহাস
১৯৯৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে নিজের প্রেমিকের সঙ্গে মিলে ১৯ বছরের সহপাঠী কলিন স্লেমারকে নৃশংসভাবে খুন করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন ক্রিস্টা। তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। টেনেসি প্রদেশে প্রায় ২০০ বছর পর প্রথম কোনো মহিলার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল তাঁর ক্ষেত্রেই। এমনকি সেই মৃত্যুদণ্ড নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করতে নিহত তরুণীর মা পর্যন্ত ফ্লোরিডা থেকে এসেছিলেন।
কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর ইঞ্জেকশন দেওয়ার সময় একাধিক গুরুতর প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দেয়। ক্রিস্টার শরীরে ‘পেন্টোবারবিটাল’ নামের প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের জন্য শিরায় আইভি লাইন বসাতে গিয়ে ব্যর্থ হন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, ওষুধটি ঠিকমতো রক্তপ্রবাহে মিশতে পারেনি, বরং বাহুর টিস্যুতে জমে গিয়ে ভয়াবহ পোড়া ক্ষত ও ফোসকা তৈরি করে। পরে তাঁকে ভেন্টিলেটরে রাখতে হয় এবং তাঁর বেঁচে থাকা নিয়ে চরম সংশয় তৈরি হয়েছিল।
মৃত্যু থেকে ফিরে কী বলছেন ক্রিস্টা?
নিজের বিবৃতিতে ক্রিস্টা জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন তিনি মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন এবং প্রিয়জনদের কাছ থেকেও বিদায় নিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েকদিন পর যখন হাসপাতালের বিছানায় তাঁর জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি সম্পূর্ণ একা, বিভ্রান্ত এবং যন্ত্রণায় কাতর। কেন তিনি বেঁচে গেলেন বা তাঁর ভাগ্যে এখন কী অপেক্ষা করছে, তার কিছুই তিনি বুঝতে পারছেন না। তবে নিজের শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি নিহত সহপাঠীর পরিবারের যন্ত্রণার কথাও মনে রেখেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এই ঘটনায় কলিন স্লেমারের পরিবার যে অপূরণীয় ক্ষতি ও কষ্টের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, তা তিনি উপলব্ধি করতে পারেন।
প্রশাসনে শোরগোল ও তদন্ত
এই ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড ঘিরে আমেরিকায় নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে টেনেসির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রদেশের গভর্নর বিল লি। পাশাপাশি চলতি বছরে নির্ধারিত অন্য একটি মৃত্যুদণ্ডের প্রক্রিয়াও স্থগিত রাখা হয়েছে। ঘটনার জেরে টেনেসির সংশোধনাগার বিভাগের কমিশনার ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রাডা নিজের পদত্যাগের ঘোষণা করেছেন।
বর্তমানে জেল হাসপাতালের চিকিৎসাধীন রয়েছেন ক্রিস্টা। তাঁর আইনজীবীরা গভর্নরের কাছে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করার আবেদন জানিয়েছেন। তবে প্রশাসনের ইঙ্গিত, আদালত নতুন কোনো নির্দেশ না দিলে তাঁর সাজা বহাল থাকার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।