ট্যাক্সি চালকের মেয়ের ইতিহাস! মাত্র ১৮ বছরে বিশ্ব কুস্তিতে রূপো জিতে সচিন তেন্ডুলকরের সঙ্গে তুলনা কাজলের

মাত্র আঠারো বছর বয়সেই বিশ্বমঞ্চে ভারতের নাম উজ্জ্বল করলেন হরিয়ানার উদীয়মান কুস্তিগির কাজল দোচক। কাজাখস্তানের আস্তানায় আয়োজিত বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপের (World Wrestling Championships) হেভিওয়েট ৭৬ কেজি বিভাগে রৌপ্য পদক জিতে ইতিহাস তৈরি করেছেন তিনি। ভারতের প্রথম হেভিওয়েট মহিলা কুস্তিগির হিসেবে বিশ্বমঞ্চে এই অনন্য নজির গড়লেন কাজল। সিনিয়র পর্যায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজের প্রথম আত্মপ্রকাশেই এই অভাবনীয় সাফল্য তাঁকে রাতারাতি ভারতীয় ক্রীড়াজগতের চর্চার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

কাজলের এই অভাবনীয় আগ্রাসন ও জয়ের খিদে দেখে জাতীয় মহিলা কুস্তি দলের প্রধান কোচ বীরেন্দ্র দাহিয়া সরাসরি তুলনা টেনে এনেছেন ক্রিকেট কিংবদন্তি সচিন তেন্ডুলকরের সঙ্গে।

সচিনের মতোই খিদে, অস্ত্রের নাম ভয়ডরহীন আগ্রাসন
কোচ বীরেন্দ্র দাহিয়ার পর্যবেক্ষণ, “১৬ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সচিন তেন্ডুলকরের অভিষেকের নেপথ্যে ছিল জয়ের প্রতি এক অদম্য খিদে। কাজলের মধ্যেও নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার একই রকম বাসনা আমি দেখেছি। আমার কোচিং কেরিয়ারে দেখা সবচেয়ে ভয়ডরহীন ও আগ্রাসী কুস্তিগির সে।”

তবে কোচের মতে, অতিরিক্ত আগ্রাসন মাঝে মধ্যে বিপক্ষের সুবিধা করে দেয়। তাই এখন কাজলের রক্ষণভাগ আরও মজবুত করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।

পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন!
সিনিয়রদের বিশ্বমঞ্চে কাজলের লড়াইয়ের ধরন সব ক্রীড়াপ্রেমীর মন জয় করে নিয়েছে। বিশেষ করে সেমিফাইনাল ম্যাচে কিরগিজস্তানের হেভিওয়েট তারকা আইপেরি মেদেত কিজির বিরুদ্ধে ১-৭ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছিলেন কাজল। কিন্তু হার না মানা মনোভাব দেখিয়ে সেখান থেকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ১০-৭ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেন তিনি।

ফাইনালে ইউক্রেনের আনাস্তাসিয়া আলপিয়েভার বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ৮-৬ স্কোরে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হয়ে রুপোতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাঁকে। এর আগে অনূর্ধ্ব-১৭ বিভাগে ২০২৪ সালে এবং অনূর্ধ্ব-২০ বিভাগে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে টানা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন সোনিপতের এই কন্যা।

‘পাখির চোখ ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক’
বিশ্বমঞ্চে রুপো জিতলেও জয়ের খিদে এতটুকু কমেনি তরুণী কাজলের। সাফল্য পেয়েও মোটেই আত্মতুষ্ট নন তিনি। তাঁর লক্ষ্য যে এখন বহু দূরে, তার প্রমাণ মেলে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইল দেখলেই। যেখানে জ্বলজ্বল করছে ‘২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক’-এর অফিশিয়াল লোগো।

সোনিপতের কুলদীপ মালিক অ্যাকাডেমিতে কাজলের কোচ অজয় মালিক জানান, “ওর একমাত্র পাখির চোখ এখন ২০২৮-এর অলিম্পিক। প্র্যাকটিসে নিজেকে বারবার এই স্বপ্নের কথা মনে করায় ও। কাজাখস্তান যাওয়ার আগেও আমাকে বলে গিয়েছিল, ‘স্যার, মেডেলটা আমাকে আনতেই হবে’।”

ক্যাব চালকের ঘরের মেয়ে, মাটির কাছাকাছি মন
সাধারণ ঘরের সন্তান কাজলের ঝুলিতে সাফল্য আসলেও পা সবসময় মাটিতেই থাকে। তাঁর বাবা সোনিপতের একজন সাধারণ ক্যাব চালক এবং মা গৃহবধূ। সম্প্রতি বিএ (BA) প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন কাজল। কাকা কিষান দোচক ছিলেন প্রাক্তন আন্তর্জাতিক কুস্তিগির। ছোটবেলায় দাদার দেখাদেখি কাকার কাছেই কুস্তির প্রারম্ভিক হাতেখড়ি তাঁর।

সোনা হাতছাড়া হলেও মাত্র ১৮ বছর বয়সেই যে বিশ্ব কুস্তিতে এক নতুন ভারতীয় তারকার জন্ম হলো, তা কাজলের এই ঐতিহাসিক পদক জয়ই প্রমাণ করে দিচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *