“শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ!”-মন্ত্রিসভার ‘ঐতিহাসিক’ সিদ্ধান্ত ঘিরে বড় শোরগোল রাজ্যে

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাঙ্গনে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। শিক্ষকদের সরাসরি সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে গ্রহণ করা হলো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। নবান্নে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে এনেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারের এই ঘোষণার পর থেকেই রাজ্য জুড়ে শিক্ষক সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং দেখা দিয়েছে একাধিক প্রশ্ন।

ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী?

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের কথা বিস্তারিত জানাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দেশের অন্যান্য অনেক রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গও এবার শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরে রাখার নীতি গ্রহণ করছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন:

“ভারতবর্ষের কোনো রাজ্যে শিক্ষকরা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন না। আজ মন্ত্রিসভায় একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজকের পর থেকে নতুন যেসব শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োজিত হবেন, তাঁরা অন্য রাজ্যের মতোই প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন না। অর্থাৎ পঞ্চায়েত, পুরসভা, লোকসভা কিংবা বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ।”

শিক্ষক সংগঠন করা যাবে কি? ধোঁয়াশা বজায় রইল

মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর শিক্ষক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বা লড়াই করার অধিকারও খর্ব করা হচ্ছে?

প্রশাসনিক সূত্রে ও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি এই নির্দেশে মূলত ‘সরাসরি রাজনৈতিক নির্বাচনে লড়াই ও কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রত্যক্ষ রাজনীতি’-র ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। শিক্ষক সংগঠন করার ওপর সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞার কথা ঘোষণা করা হয়নি। তবে সরাসরি রাজনৈতিক কোনো দলের ছত্রছায়ায় থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক কাজ করলে ভবিষ্যতে তা আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে কি না, তা নিয়ে এখনও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছে।

ইতিমধ্যে যাঁরা জয়ী বা রাজনীতিতে যুক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়ম কী?

নতুন নিয়মে পুরনো শিক্ষকদের ক্ষেত্রে স্বস্তি বহাল রাখা হয়েছে। যাঁরা ইতিমধ্যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা নির্বাচনে জিতে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে না।

এই বিষয়ে নিশ্চিত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন:

“যাঁরা ইতিমধ্যেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং যে অধিকার তাঁরা আগে পেয়েছিলেন, সেই অধিকার আমরা খর্ব করছি না। পরবর্তীতে স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC)-এর মাধ্যমে নতুন যেসব শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ পাবেন, তাঁদের ক্ষেত্রেই নিয়মটি কার্যকর হবে এবং এটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার শর্তের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হলো।”

শিক্ষায় কেন এই কঠোর সিদ্ধান্ত?

শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ৩৪ বছরের বাম শাসন এবং ১৫ বছরের তৃণমূল জমানায় শিক্ষার মান সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল।

তিনি স্পষ্ট জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিদ্যাপীঠের পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে এবং ‘শিক্ষক’ পদের মর্যাদা রক্ষা করার জন্যই বিজেপি সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নীতিতে এটি একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পদক্ষেপ হতে চলেছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এই নীতি বাস্তবে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে এবং শিক্ষক মহল এটিকে কীভাবে গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন নজর সকলের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *