‘লাল পতাকা ছেড়ে যাব না…’ ২০১২-তে বলেছিলেন ইন্দ্রনীল, তারপর কীভাবে তৃণমূলের মন্ত্রী?

দুর্গাপুজোর পাসের নামে কোটি কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন গ্রেফতার হতেই নতুন করে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। তবে শুধু দুর্নীতির তদন্তই নয়, তাঁর গ্রেফতারির পর আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে তাঁর অতীত রাজনৈতিক রূপান্তর। একসময় বামফ্রন্টের কট্টর সমর্থক ও প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্নেহধন্য গায়ক কীভাবে পরবর্তীতে তৃণমূলে যোগ দিয়ে মন্ত্রিত্ব পেলেন, তা নিয়ে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

“লাল পতাকা ছেড়ে যাব না” — ২০১২-র সেই আলোচিত ঘোষণা

২০১২ সালের জানুয়ারি মাস। বামফ্রন্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘গণশক্তি’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠা দিবস। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়েই স্পষ্ট গলায় মাইক হাতে ইন্দ্রনীল সেন ঘোষণা করেছিলেন, “লাল পতাকা ছেড়ে যাব না…”।

সেদিন তাঁর বক্তব্য শেষে হাততালিতে ফেটে পড়েছিল সভাগৃহ। এরপর তিনি গেয়ে উঠেছিলেন, “ধরো হাল শক্ত হাতে…”। শুধু তা-ই নয়, নব্বইয়ের দশকে তাঁর গাওয়া রিমেক গান ‘দূরের বলাকা’ অ্যালবাম বিপুল সাফল্য পাওয়ার পর প্রতিটি পুজো প্যান্ডেলে তা বাজত। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং তাঁর পরিবারের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন এই গায়ক।

“সিপিএমের ব্লু-আইড বয় ছিলেন” — সোচ্চার শুভেন্দু অধিকারী

ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারির পর মুখ্যমন্ত্রীর নবান্নের সাংবাদিক বৈঠকে উঠে আসে তাঁর অতীতের এই বাম-যোগাযোগের প্রসঙ্গ।

শুভেন্দু অধিকারী কড়া ভাষায় বলেন:

“উনি তো একসময় সিপিএমের ‘ব্লু-আইড বয়’ ছিলেন। প্রয়াত একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ের একটি এনজিওর সাথেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই ধরনের মানুষেরা সময়ের প্রয়োজনে জলের মতো নিজস্ব আকার পরিবর্তন করেন। তবে এখন বিজপির দরজা পুরোপুরি বন্ধ। রাজ্য পরিবর্তনের পর ইনি অমিল থেকে তৃণমূলে ঘেঁষেছিলেন, কিন্তু এখন আর পার পাবেন না।”

২০১৪-তে হারলেও কীভাবে মমতার ‘গুড বুক’-এ ঢুকলেন ইন্দ্রনীল?

বাম সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ গায়ক ইন্দ্রনীল সেন খুব দ্রুতই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন।

  • লোকসভা নির্বাচন (২০১৪): মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রার্থী করেন। সেই নির্বাচনে হারলেও মমতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা কমেনি।

  • বিধানসভা নির্বাচন (২০১৬): চন্দননগর কেন্দ্র থেকে জয়ী হওয়ার পর তাঁকেই রাজ্য মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেওয়া হয়। দায়িত্ব পান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের, এবং পরবর্তীতে পর্যটন দফতরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলান।

বাম নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদ

রাজনৈতিক মতাদর্শ বদলালেও বামপন্থী বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন ইন্দ্রনীল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অসুস্থতার সময়েও তাঁর কন্যা সুচেতনা ভট্টাচার্যের খোঁজখবর নিয়েছিলেন তিনি। ইন্দ্রনীলের মতে, ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ও রাজনীতির পথ আলাদা হওয়া উচিত।

শুভেন্দু অধিকারীর আরও অভিযোগ, নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়ও সিপিএমের হয়ে প্রচার চালিয়ছিলেন ইন্দ্রনীল। তবে আজ আর্থিক দুর্নীতির জালে জড়িয়ে গ্রেফতার হওয়ার পর, তাঁর সেই বর্ণময় এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের ইতিহাস নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

উপসংহার:

কোটি কোটি টাকার ইডি কেলেঙ্কারির পাশাপাশি ইন্দ্রনীল সেনের এই বহুরূপী রাজনৈতিক সফর এখন রাজনীতির অন্দরে প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *