বক্সায় ছাড়া বাঘিনী এবার অসমে, এ বার কী হবে? বনমন্ত্রী কি জানালেন…?

উত্তরবঙ্গের বক্সা টাইগার রিজার্ভে বহু বছর পর বাঘের স্থায়ী আবাস গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখেছিল রাজ্যের বন দফতর, তাতে বড়সড় ধাক্কা লাগল। গত ২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মজয়ন্তীতে বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে এনে বক্সার জঙ্গলে ছাড়া হয়েছিল সাড়ে তিন বছরের একটি বাঘিনী। সেই বিশেষ শুভসূচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ভূপেন্দ্ৰ যাদব। তবে ছাড়ার এক মাস কাটতে না কাটতেই এনক্লোজার ছেড়ে উধাও হয়ে গিয়েছে সেই বাঘিনী।

বন দফতর সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, বাঘিনীটি আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামের রায়ডাক ও সংক্রান্ত সঙ্কোশ নদী পেরিয়ে হেঁটে সোজা পড়শি রাজ্য অসমের কোকরাঝাড় জেলার রাইমোনা টাইগার রিজার্ভ এলাকায় প্রবেশ করেছে।

অসমে গিয়ে পেটপুজো বাঘিনীর!

অসমের বনকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গ বন দফতর থেকে আসা স্যাটেলাইট রেডিও কলার পরা বাঘিনীটি বর্তমানে তাঁদের রাইমোনা টাইগার রিজার্ভের কাছাকাছি রাজেন্দ্রপুর বনবস্তি এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। অসমে গিয়েই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছে বাঘিনীটি— গত দু’দিনে অন্তত দু’টি গৃহপালিত শুয়োর শিকার করে পেট ভরে খেয়েছে সে।

বর্তমানে বাঘিনীটির গতিবিধির ওপর ২৪ ঘণ্টা কড়া নজর রাখছে অসম বন দফতরের একটি বিশেষ দল। তাদের সঙ্গ দিচ্ছে ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII), ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)-র বিশেষজ্ঞ দল এবং বক্সা থেকে সেখানে পৌঁছে যাওয়া টাইগার স্কোয়াডের ৪০ জন সদস্যের একটি বিশেষ টিম।

বাঘিনীকে ফেরাতে ব্যাকফুটে বন দফতর

বাঘিনীটিকে সুস্থভাবে উদ্ধার করে বক্সে ফিরিয়ে আনার জন্য সবরকম প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। যে বিশেষ উদ্ধারকারী দলটি অসমে অবস্থান করছে, তাদের সঙ্গে ট্র্যাঙ্কুলাইজার (ঘুমপাড়ানি গুলি) মাস্টারও রয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গ বন দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, মুক্ত হওয়ার পর বাঘিনীটি প্রথমে বক্সার পঁচিশ মাইল টাওয়ার থেকে পূর্বদিকে এগোতে থাকে। এরপর জয়ন্তী ও চুনিয়া পার হয়ে শেষমেশ সঙ্কোশ নদীর পাড়ে পৌঁছায় এবং নদী পেরিয়ে অসমে ঢোকে। উল্লেখ্য, ২০২১ সালে টাইগার রিজার্ভের মর্যাদা পাওয়া অসমের রাইমোনায় বর্তমানে ৬টি বাঘ-বাঘিনী রয়েছে।

কী বলছেন রাজ্যের বনমন্ত্রী?

রাজ্যের বনমন্ত্রী তথা বিজেপি বিধায়ক মনোজ কুমার ওরাওঁ এই বিষয়ে জানান, বাঘিনীটি বর্তমানে অসমে রয়েছে এবং তাকে রাজ্য ফেরানোর জন্য যাবতীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রয়োজন পড়লে তাকে ঘুমপাড়ানি গুলি ছুড়ে (ট্র্যাঙ্কুলাইজ করে) নিয়ে আসা হবে।

তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে ব্যাখ্যা করেছেন বনমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “বক্সা, সঙ্কোশ ও অসম পুরো এলাকাটাই একটা প্রাকৃতিক বন্যপ্রাণ করিডর। জঙ্গল থেকে অসমের দূরত্ব খুব বেশি নয়। তাই বাঘের জন্য এই করিডর ধরে যাতায়াত করাটা সম্পূর্ণ একটি স্বাভাবিক আচরণ।”

নভেম্বরেই আসছে আরও এক পুরুষ বাঘ

বক্সায় বাঘের বংশবৃদ্ধির ঐতিহাসিক উদ্যোগ থমকে যাচ্ছে না। প্রথম পর্যায়ে এই বাঘিনীকে আনার পর, আগামী নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে একটি পুরুষ বাঘ আনা হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন বনমন্ত্রী। পরবর্তীতে আনা হবে আরও একটি বাঘিনী। মূল উদ্দেশ্য হল, অন্তত একটি বাঘ ও দু’টি বাঘিনীর মাধ্যমে বক্সার জঙ্গলে নতুন প্রজন্মের বাঘের জন্ম দেওয়া।

প্রসঙ্গত, আটের দশকে বক্সায় প্রায় ২০টি বাঘের উপস্থিতি ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসম থেকে একাধিকবার বাঘ এলেও তারা স্থায়ীভাবে সেখানে টেকেনি। বিহারের বাঘিনীও সীমানা পার হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠছে— পরিবেশ কি সত্যিই বক্সায় বাঘ ধরে রাখার উপযুক্ত, নাকি ঘাটতি রয়ে গিয়েছে নজরদারিতে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *