সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে গর্ভবতী মহিলা সাংবাদিককে ধাক্কা! রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে জারি আদালতের কড়া নির্দেশ!

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলা সাংবাদিককে হেনস্থা ও ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই এবার আরও জোরালো রূপ নিল। ১১ সপ্তাহ ৩ দিনের গর্ভবতী ওই সাংবাদিকের দায়ের করা আবেদনের ভিত্তিতে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষকে নোটিস জারির নির্দেশ দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, স্রেফ মুখের কথায় বা রাজপথের রাজনৈতিক যুক্তিতে নয়, জমা পড়া আবেদনের তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারপ্রক্রিয়া চালানো হবে।

ঘটনার সূত্রপাত ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ অক্টোবর। নির্বাচন কমিশনের ‘এসআইআর’ (SIR) ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন জমা দিতে এসেছিলেন রাহুল গান্ধী সহ অন্যান্য বিরোধী নেতৃত্ব। অভিযোগ, আদালত চত্বরে মিছিল করে ঢোকার সময় লোকসভার বিরোধী দলনেতা হঠাৎই মূল গেটের দিকে ওই মহিলা সাংবাদিককে সজোরে ধাক্কা দেন। ভিড়ের চাপে নিজের শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়েন ওই অন্তঃসত্ত্বা সাংবাদিক এবং নিজের দুই হাতে ভর দিয়ে পেট ও সন্তানকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি কোনও অনিচ্ছাকৃত ভিড়ের ধাক্কাধাক্কি ছিল না। নিরাপত্তা কর্মী ও একাধিক সহ-সাংবাদিকের উপস্থিতিতেই ওই সাংবাদিক বারবার “আমাকে ধাক্কা দেবেন না” বলে আকুতি জানান সত্ত্বেও প্রকাশ্যে তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয়। মাটিতে পড়ে যাওয়ার জেরে তাঁর হাতে মারাত্মক চোট লাগে, মুখের কাছে থাকা মাইক্রোফোনের রিসিভারটি খুলে ছিটকে যায় এবং তাঁর মোবাইল ফোনটি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সেদিনের ঘটনার পুরো ডিজিটাল রেকর্ডিং তাঁর সাথে থাকা চিত্রগ্রাহকের ক্যামেরায় স্পষ্ট ধরা রয়েছে বলেও আদালতকে জানানো হয়েছে।

হাসপাতাল ভর্তি ও মানসিক ট্রমা
ঘটনার পর পরই তলপেটে মারাত্মক যন্ত্রণা শুরু হওয়ায় রাত ৯টা নাগাদ তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধপত্র দিয়ে ছাড়ার সময় চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, পুনরায় তলপেটে যন্ত্রণা বা রক্তপাত হলে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

আবেদনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান ফটকে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়া, গর্ভস্থ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগ এবং প্রকাশ্যে অপমানের ঘটনা ওই সাংবাদিককে শারীরিকভাবে রক্তাক্ত করার পাশাপাশি মানসিকভাবেও গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছে। তিনি যখন ‘স্যার আমাকে ধাক্কা দেওয়া হচ্ছে, দয়া করে ধাক্কা দেবেন না’ বলে অনুনয় করছিলেন, তখন আশেপাশের কংগ্রেস কর্মীদের ‘রাহুল গান্ধী জিন্দাবাদ’ স্লোগানে তাঁর আর্তনাদ চাপা পড়ে যায়। আরও মারাত্মক অভিযোগ, রক্তাপ্লুত অবস্থায় পড়ে থাকার পরও রাহুল গান্ধী, তাঁর সঙ্গী নেতারা বা নিরাপত্তা কর্মীদের কেউই তাঁকে ন্যূনতম সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। তিনি প্রায় ৪০ মিনিট ধরে সাহায্য পাওয়ার আশায় ফুটপাতে বসে কাটিয়েছেন।

আইনি পদক্ষেপ ও মূল দাবিগুলো
ঘটনার পর থেকে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক অপপ্রচার’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও, ওই সাংবাদিকের স্পষ্ট দাবি—তিনি একজন পেশাদার ও স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন, কোনও বিক্ষোভকারী হিসেবে নয়। গত ১৭ অক্টোবর দিল্লির ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের কাছে রাহুল গান্ধী ও অন্যদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র একাধিক জামিনঅযোগ্য ধারায় এফআইআর দায়ের করলেও পুলিশ এখনও নিষ্ক্রিয় বলে অভিযোগ।

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে রাজনৈতিক মিছিল ও বিক্ষোভ বন্ধের দাবিতে বিচারাধীন একটি মূল মামলার সঙ্গেই এই আবেদনটি যুক্ত করা হয়েছে। মামলাকারীর পক্ষে বর্ষীয়ান আইনজীবী গৌরব ভাটিয়া সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আদালত পূজাবকাশের পরেই এই মামলার বিস্তারিত শুনানির আশ্বাস দিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের কাছে পেশ করা মূল দাবিগুলি হলো:

স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত: সুপ্রিম কোর্ট চত্বরের এই নজিরবিহীন ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ।

তৎক্ষণাৎ এফআইআর: ১৭ অক্টোবরের অভিযোগের ভিত্তিতে রাহুল গান্ধী সহ জড়িতদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে এফআইআর নথিভুক্ত করা এবং তার স্ট্যাটাস রিপোর্ট আদালতে পেশ।

প্রমাণ সংরক্ষণ: ১২ অক্টোবরের যাবতীয় সিসিটিভি ফুটেজ, প্রবেশের ট্র্যাকিং লগ, ভিজিটর পাস এবং ভিডিও রেকর্ডিং সংরক্ষণের নির্দেশ।

আর্থিক ক্ষতিপূরণ: শারীরিক ও মানসিক আঘাতের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কেন্দ্র, রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী ও পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান।

নিঃশর্ত ক্ষমা: রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস দলকে ওই ভুক্তভোগী সাংবাদিকের কাছে প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ।

নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা: দিল্লির পুলিশ কমিশনারের মাধ্যমে আবেদনকারী ও তাঁর পরিবারের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং তাঁর চিকিৎসার গোপন নথি প্রকাশ্যে আনা বন্ধ করা।

আদালত অবমাননা: সর্বোচ্চ আদালত চত্বরে এই আক্রমণের ঘটনার জন্য রাহুল গান্ধী সহ দোষীদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা (Contempt of Court) শুরু করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *