“এত ভাল দুর্গাপুজো বহু বছর দেখিনি”-বাংলাদেশে কেমন কাটল হিন্দুদের দুর্গাপুজো?

দীর্ঘ বছরের ভয়, আতঙ্ক আর শঙ্কার মেঘ কাটিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়। বিগত বেশ কয়েকটি বছরের তুলনায় এ বারের দুর্গাপুজো অনেকটাই নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় খুশি ওড়াকান্দির দেশপারারের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের উপচে পড়া ভিড়, প্রতিমা দর্শন থেকে শুরু করে বিজয়া দশমীর বিসর্জনের শোভাযাত্রা—সবমিলিয়ে এ বারের পুজোয় যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল বাংলাদেশ।

নাটোরের বাসিন্দা, ২৯ বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতক সোহাগ কুমার মণ্ডল জানান, এ বার নিজের শহরের প্রায় ২০টি পুজোমণ্ডপ ঘুরেছেন তিনি। তাঁর কথায়, আগের বছরগুলিতে পুজোর সময় যে অজানা আতঙ্ক কাজ করত, এ বার তা অনেকটাই কম ছিল। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথও স্বীকার করেছেন যে, এ বারের পুজো আগের যে কোনও বারের চেয়ে ঢের ভালো হয়েছে। এর পিছনে পুজোর ছুটি বৃদ্ধি, আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিজে বিভিন্ন পুজোমণ্ডপ পরিদর্শন করার ঘটনাটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।

বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ ও নিরাপত্তার কড়া বর্ম: রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বর্তমান সরকারের কাছে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় পরীক্ষা ছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুজোকে কেন্দ্র করে অন্তত ৮৪টি হিংসাত্মক ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি শেখ হাসিনার আমলেও বারবার মণ্ডপে হামলার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এ বার বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দুর্গাপুজোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনোও ফাঁক রাখেনি প্রশাসন। পুলিশ, বিজিবি এবং সোয়াট বাহিনীকে নিয়ে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছিল। গ্রামের মণ্ডপগুলোতেও অস্ত্রধারী পুলিশ ও আনসার সদস্য এবং সিসিটিভি ক্যামেরার কড়া পাহারা ছিল। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় এ বার ৪৯৬টি বাড়িয়ে মোট ৩৩,৮৫১টি পুজো অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে।

হিন্দু ভোটের নতুন সমীকরণ? ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের হিন্দুদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগের সমর্থক। তবে রাজনৈতিক পটবদলের পর বিএনপি এবং জামাত-ই-ইসলামির মতো দলগুলোও এখন হিন্দু ভোটারদের মন জয় করার কৌশলে হাঁটছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পুজোমণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং মন্ত্রীরাও মাঠে নামেন। অন্যদিকে, জামাত প্রধান শফিকুর রহমানও হিন্দু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, আসন্ন নির্বাচনী রাজনীতির সমীকরণেই এ বার নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি তৎপরতা দেখিয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলি।

উৎসব কাটলেও আশঙ্কা কি পুরোপুরি কেটেছে? মোতের উপর পুজো শান্তিপূর্ণ কাটলেও গোড়ায় পুরোপুরি মেঘ কাটেনি। উৎসবের আগেই প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দির হামলার মতো ৩৪টি অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ তোলে পুজো উদযাপন পরিষদ। মহাষষ্ঠীর দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোমাংসের ভোজ ও খিচুড়ি রান্নার মতো ঘটনায় সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হলেও পুজোর দিনগুলিতে বড় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।

তবে পুজো শান্তিপূর্ণভাবে মিটলেও বাংলাদেশের হিন্দুদের মূল দাবি একটাই—নিরাপত্তা যেন শুধু কয়েকটি দিনের জন্য না হয়। মণীন্দ্র কুমার নাথ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, প্রতিটি উৎসব পালনের জন্য অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষীর প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়। ৩৬৫ দিনই ধর্মীয় স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং স্থায়ী নিরাপত্তার পাশাপাশি অতীতে ঘটে যাওয়া সমস্ত হামলার কঠোর বিচার চান তাঁরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *