স্তনে গাঁট না থাকলেও হতে পারে ক্যানসার! কোন কোন গোপন লক্ষণে লুকিয়ে রয়েছে বড় বিপদের ইঙ্গিত?

ক্যানসার শব্দটির মুখোমুখি হওয়া মাত্রই আমাদের মনে এক অজানা আতঙ্ক ও আশঙ্কার মেঘ জমা হয়। আর তা যদি হয় স্তন ক্যানসার, তবে দুশ্চিন্তার মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক অগ্রগতি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা অভয় দিয়ে বলছেন—ভয় বা আতঙ্ক নয়, সঠিক সময়ে সচেতনতাই হতে পারে এই মারণ ব্যাধির বিরুদ্ধে মূল হাতিয়ার। প্রাথমিক পর্যায় বা আর্লি স্টেজে এই রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব। সাধারণত আমরা মনে করি স্তনে কোনো শক্ত গাঁট বা লাম্প তৈরি হওয়াই এই ক্যানসারের একমাত্র লক্ষণ। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি বেশ ভিন্ন। স্তনের আকার-আকৃতি পরিবর্তন, ত্বকের রঙ বদলে যাওয়া, নিপল থেকে অস্বাভাবিক নিসেক কিংবা বগলের চারপাশে ফোলা ভাবও হতে পারে মারাত্মক সতর্কবার্তা। তাই সচেতনতার স্বার্থে স্তন ক্যানসারের বিচিত্র ধরন, উপসর্গ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, স্তনের কোষ যখন অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, তখনই ক্যানসারের রূপ নেয়। মূলত স্তনের দুধবাহী নালি কিংবা দুধ উৎপাদনকারী গ্রন্থি থেকেই এই রোগের সূত্রপাত ঘটে। প্রাথমিক অবস্থায় গুরুত্ব না দিলে বা চিকিৎসা শুরু করতে বিলম্ব হলে এই ক্যানসার কোষ চারপাশের স্বাস্থ্যকর টিস্যু, লসিকাগ্রন্থি এবং রক্তের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্তন ক্যানসারের বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যার মধ্যে ‘ডাক্টাল কার্সিনোমা ইন সিটু’ অন্যতম, যা মূলত দুধবাহী নালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং সহজে অন্য টিস্যুতে ছড়ায় না। তবে ‘ইনভেসিভ ডাক্টাল কার্সিনোমা’ হলো সবচেয়ে পরিচিত ও সাধারণ ধরন, যা নালি ছাড়িয়ে আশেপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রাখে। অন্যদিকে, দুধ উৎপাদনকারী গ্রন্থি থেকে সৃষ্ট ক্যানসারকে বলা হয় ‘ইনভেসিভ লোবিউলার কার্সিনোমা’। এছাড়া ‘ইনফ্ল্যামেটরি ব্রেস্ট ক্যানসার’ নামক এক বিরল ধরনের ক্ষেত্রে স্তনে স্পষ্ট কোনো গাঁট থাকে না, বরং ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, ফুলে ওঠা বা কমলালেবুর খোসার মতো হয়ে যাওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়। সবশেষে, ‘ট্রিপল-নেগেটিভ ব্রেস্ট ক্যানসার’ হলো একটি জটিল প্রজাতি, যেখানে ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন ও HER2 রিসেপ্টরের উপস্থিতি থাকে না এবং এর চিকিৎসাপদ্ধতিও কিছুটা আলাদা।
শরীরে নতুন কোনো অস্বাভাবিকতা নজরে আসলেই অবিলম্বে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্তন বা বগলের নিচে নতুন গাঁট, স্তনের আকৃতিতে হঠাৎ পরিবর্তন, নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া, নিপল থেকে রক্ত বা তরল নির্গমন এবং ত্বকের সংকোচন দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। এই লক্ষণগুলি দেখা দেওয়া মানেই যে ক্যানসার তা নয়, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং ও রোগ নির্ণয়ই সুস্থতার নিশ্চিত পথ খুলে দেয়।