খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রাণ সংশয়? বিক্ষোভের কভারেজে বড় নির্দেশিকা জারি প্রেস কাউন্সিলের!

বিক্ষোভ, আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক প্রতিবাদের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময়ই মারাত্মক বিপদের মুখে পড়তে হয় মাঠের সাংবাদিকদের। কখনো উত্তাল জনতা, কখনো আবার পুলিশের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষ, কিংবা ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়ার মতো চরম আশঙ্কার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। এই ধরনের রক্তক্ষয়ী ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে রিপোর্টিং করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিজেদের ব্যক্তিগত শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই সমস্ত বাস্তব দিক মাথায় রেখেই এবার দেশের সাংবাদিকদের সুরক্ষায় একগুচ্ছ অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রকাশ করল প্রেস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (Press Council of India)। প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় মাঠে ময়দানে কাজ করার সময় সাংবাদিকদের বৈধ পরিচয়পত্র দৃশ্যমান রাখা, ভিড়ের মধ্যে নিরাপদে অবস্থান করা, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার পথ বা এক্সিট রুট চিহ্নিত করা এবং সর্বপরি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রেস কাউন্সিলের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, খবর সংগ্রহের জন্য কোনো প্রতিবাদ বা বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের অবশ্যই তাঁদের সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বৈধ পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড সঙ্গে রাখতে হবে। প্রয়োজনে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক অনুমোদিত পিআইবি (PIB) কিংবা রাজ্য সরকারের ডিআইপি (DIP) স্বীকৃতির কার্ডও কাছে রাখা বাধ্যতামূলক। পরিচয়পত্রটি এমনভাবে ঝুলিয়ে বা আটকে রাখতে হবে যাতে দূর থেকেই একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তাঁদের সহজে চেনা যায়। তবে গলায় ফিতে দিয়ে ল্যানিয়ার্ড ঝুলিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, যাতে উন্মত্ত ভিড়ের মাঝে তা কোনোভাবে আটকে গিয়ে বড় ধরনের বিপদের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশের সঙ্গে কথা বলার সময় সম্পূর্ণ শান্ত ও মার্জিতভাবে নিজের পেশাগত পরিচয় দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কোনো বিক্ষোভে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেওয়া, কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে স্লোগান দেওয়া কিংবা পরিস্থিতি আরও বেশি উত্তপ্ত করে তুলতে পারে এমন কোনো উসকানিমূলক আচরণ করা থেকে সাংবাদিকদের কঠোরভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া যেকোনো আইনসম্মত নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা প্রতিটি রিপোর্টারের দায়িত্ব।
বিক্ষোভ বা সংঘর্ষের এলাকায় রিপোর্টিংয়ের সময় সাংবাদিকদের সব সময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের ব্যারিকেড, পুলিশের গাড়ি বা অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঠিক সামনে ক্যামেরা, ট্রাইপড কিংবা কোনো রেকর্ডিংয়ের যন্ত্রপাতি এমনভাবে রাখা যাবে না যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলাচলে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি হয় বা সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হয়। ভিড়ের মধ্য দিয়ে হাঁটাচলার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, যাতে হড়কে পড়ে যাওয়ার বা পদপিষ্ট হওয়ার ন্যূনতম ঝুঁকিও এড়ানো যায়। চারপাশের পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর সর্বদা তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে সাংবাদিকদের। কোনো নির্দিষ্ট পয়েন্টে উত্তেজনা হঠাৎ বাড়ছে কি না কিংবা উন্মত্ত ভিড়ের আচরণ হিংসাত্মক হয়ে উঠছে কি না, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি কাজ শুরু করার আগেই সম্ভাব্য এক্সিট রুট বা নিরাপদভাবে বেরিয়ে আসার রাস্তা, খোলা গলি, ফুটপাত এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলি আগে থেকেই মানসিকভাবে চিহ্নিত করে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো কারণে এলাকায় কাঁদানে গ্যাস বা ধোঁয়া ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হলে ভিড়ের আরও গভীরে না গিয়ে দ্রুত সেই নিরাপদ পথ ধরেই সরে পড়তে হবে।
মাঠে কাজ করার সময় সাংবাদিকদের একটি ছোট অথচ কার্যকরী জরুরি কিট বা ইমার্জেন্সি ব্যাগ সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই কিটের মধ্যে ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, জীবনদায়ী ওষুধ, পর্যাপ্ত পানীয় জল, শুকনো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, টর্চলাইট, গামছা বা ভেজা তোয়ালে এবং চোখকে ধোঁয়া ও ধুলোবালি থেকে রক্ষা করার জন্য ভালো মানের সানগ্লাস রাখা বাঞ্ছনীয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত সুরক্ষামূলক গিয়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই মাটিতে পড়ে থাকা কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টার, ফ্ল্যাশ-ব্যাং বা স্মোক গ্রেনেডে হাত দিতে বা তা স্পর্শ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব বজায় রাখার স্বার্থে খবরের সত্যতা যাচাইয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। অফিসের ডেস্ক বা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। যদি কোনো সাংবাদিক একা ফিল্ডে কাজ করেন, তবে তাঁর বর্তমান লোকেশন এবং সেখান থেকে ফেরার সম্ভাব্য সময় কোনো বিশ্বস্ত সম্পাদক বা সহকর্মীকে জানিয়ে রাখা উচিত। যেকোনো সংবেদনশীল বিক্ষোভের খবর করার সময় একাধিক স্বাধীন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ক্রস-চেক বা যাচাই করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের মতামত, রাজনৈতিক অভিযোগ ও পরীক্ষিত তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক বজায় রাখতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশের কৌশলগত অবস্থান, নিরাপত্তা বাহিনীর গতিবিধি বা ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গোপনীয় রুট কখনোই সরাসরি সম্প্রচার বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা যাবে না। একই সঙ্গে কোনো আহত ব্যক্তি, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু বা বিপন্ন সাধারণ মানুষের ক্লোজ-আপ ছবি প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তাঁদের গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনা করতে হবে। সব মিলিয়ে, বিক্ষোভের মতো জটিল ও হিংসাত্মক পরিস্থিতিতে রিপোর্টিং করার সময়ও সাংবাদিকদের নিজেদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখা, তথ্যের নিখুঁত সত্যতা যাচাই করা এবং নিজেদের পাশাপাশি অন্যের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিয়েছে প্রেস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া।