ভারতের বাজারে স্টারলিঙ্ক সংঘাত! ইলন মাস্কের তীব্র কটাক্ষের পর অবশেষে নীরবতা ভাঙল আম্বানির রিলায়েন্স!

ভারতের উদীয়মান স্যাটেলাইট ইন্টারনেট খাতে প্রবেশ করতে পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্কের সংস্থা ‘স্টারলিঙ্ক’। তবে ভারতে স্যাটেলাইট পরিষেবা চালুকে কেন্দ্র করে ইলন মাস্ক ও দেশের শীর্ষ শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে উঠেছে। এই তীব্র প্রতিযোগিতার আবহেই এবার সরাসরি মুখ খুলল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ। সংস্থার পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তারা কোনো ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাকে ভয় পায় না। তবে তাদের দাবি, দেশি কিংবা বিদেশি—যে সংস্থাই ভারতের বাজারে ব্যবসা করতে আসুক না কেন, সবার ক্ষেত্রে যেন একই ধরনের আইনি নিয়ম ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় থাকে। ভারতীয় টেলিকম বাজারে রিলায়েন্স জিও এবং স্টারলিঙ্কের সম্ভাব্য দ্বৈরথ নিয়ে জল্পনার মাঝেই আম্বানির সংস্থার এই কড়া প্রতিক্রিয়া নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি ভারতের বাজারে স্টারলিঙ্কের অনুমোদন পাওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন ইলন মাস্ক। তাঁর অভিযোগ ছিল, বেশ কিছু কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং প্রতিষ্ঠিত টেলিকম সংস্থা ভারতের বাজারে স্টারলিঙ্কের প্রবেশকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আটকে রাখার চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষিতে রিলায়েন্সের আধিপত্য নিয়েও পরোক্ষে প্রশ্ন তোলেন তিনি। কিন্তু সেই অভিযোগের জবাবে রিলায়েন্স শুক্রবার তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানায়, ভারতের ভূখণ্ডে ব্যবসা করতে হলে দেশের সব সংস্থাকেই সেখানকার আইন ও সার্বভৌম নীতি মেনে কাজ করতে হবে। কেন্দ্রও জানিয়েছে, দেশি বা বিদেশি সব আবেদনকারীর জন্যই এক ও অভিন্ন অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রযোজ্য। রিলায়েন্স দাবি করেছে, তাদের নিজস্ব যৌথ স্যাটেলাইট সার্ভিস ‘জিও স্পেসফাইবার’-কেও পরিষেবা শুরু করার আগে এখনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এর আগে সমাজমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে মুকেশ আম্বানি ও তাঁর সমর্থকদের তীব্র নিশানা করেছিলেন মাস্ক। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, একদিকে দাবি করা হচ্ছে যে জিও-র সুলভ ডেটা প্ল্যানের সঙ্গে স্টারলিঙ্ক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না, আবার অন্যদিকে অভিযোগ তোলা হচ্ছে যে স্টারলিঙ্ক বাজারে এলে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করবে। মাস্কের মতে, এই দুই পরস্পরবিরোধী যুক্তি আসলে বিভ্রান্তিকর। তিনি আরও মন্তব্য করেন, স্টারলিঙ্ক ভারতে এলে দেশের কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহক উচ্চগতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের সেরা বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে আম্বানির ব্যক্তিগত মুনাফায় সামান্য প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য বন্ধ হয়ে যাবে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে ট্যাগ করে করা একাধিক ব্যঙ্গাত্মক পোস্টেও ভারতীয় বাজারের আমলাতান্ত্রিক বাধা ও একচেটিয়া আধিপত্যের সমালোচনা করেন তিনি।
মাস্কের এই সব কটাক্ষের জবাব দিয়েই রিলায়েন্স জানিয়েছে, বাজারমুখী যেকোনো প্রতিযোগিতাকে তারা সবসময়ই নিজেদের সেবার গুণমান প্রমাণের দারুণ সুযোগ হিসেবে দেখে এসেছে। ২০১৬ সালে ভারতের টেলিকম খাতে যখন জিও প্রথম পা রেখেছিল, তখন তাদের শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল। অথচ মাত্র এক দশকের মধ্যে নিরলস উদ্ভাবন ও বিশ্বমানের সেবার ওপর ভর করে সংস্থাটি বর্তমানে ৫৩ কোটিরও বেশি গ্রাহকের ট্রাস্ট অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। রিলায়েন্সের মতে, জিও-র এই অভূতপূর্ব উত্থানই প্রমাণ করে যে ভারতীয় বাজারে সঠিক পরিষেবা দিতে পারলে যেকোনো নতুন সংস্থাই নিজেদের মজবুত স্থান তৈরি করে নিতে পারে। তাই স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রটিতেও প্রতিযোগিতা নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই, بشرط সব সংস্থাকে সমমানের নিয়ম মেনে চলতে হবে।
স্টারলিঙ্ক যদি ভারতে তাদের হাই-স্পিড স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা শুরু করার অনুমোদন পায়, তবে বিশেষ করে দেশের দুর্গম, পাহাড়ি ও প্রান্তিক গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল সংযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। তবে সেই সুবিধার কথা মাথায় রেখেও জাতীয় নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র কোনোভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে, রিলায়েন্সের বার্তা অত্যন্ত সাফ—তারা স্টারলিঙ্ক সহ বিশ্বের যেকোনো প্রযুক্তি সংস্থাকে ভারতে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত, তবে নিয়ম-কানুন ও আইনি কাঠামোর দিক থেকে জিও কিংবা স্টারলিঙ্ক—কাউকেই কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া চলবে না। এখন দেখার, আম্বানির সংস্থার এই অবস্থান স্পষ্ট করার পর স্পেস-এক্স ও স্টারলিঙ্ক প্রধান ইলন মাস্ক নতুন কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানান কি না।