“বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দুর দোকানে!” পুজোর মুখে শিলিগুড়িজুড়ে বিতর্কিত পোস্টার, চরম তোলপাড় উত্তরবঙ্গে

দুর্গাপূজার আবহে সম্প্রীতির চিরাচরিত উৎসবের আমেজে বড়সড় বিতর্ক উসকে দিল একটি পোস্টার। উৎসবের মুখে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়ি শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান মোড়ে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের তরফে সাঁটানো হয়েছে একের পর এক বিতর্কিত ব্যানার ও পোস্টার। যেখানে স্পষ্টভাবে বার্তা দেওয়া হয়েছে—পুজোর সামগ্রী কেনা থেকে শুরু করে মাংস ও বিরিয়ানি খাওয়ার ক্ষেত্রে কেবল সনাতনী বা হিন্দু পরিচালিত দোকান থেকেই কেনাকাটা করতে হবে!
রবিবার সকাল থেকে শহরের রাস্তায় এই ধরনের পোস্টার নজরে আসতেই তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে।
কী লেখা রয়েছে বিতর্কিত ওই পোস্টারগুলিতে?
শহরের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মোড়ে লাগানো পোস্টারগুলিতে লেখা রয়েছে:
-
“বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু দোকানে”
-
“পুজোর সামগ্রী কিনুন হিন্দু দোকান থেকে”
-
কোথাও আবার পথচলতি মানুষকে সতর্ক করার ভঙ্গিতে লেখা হয়েছে, “ফেরিওয়ালা কে? তা একটু ভেবে দেখুন”।
হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সাফাই
পোস্টার বিতর্ক চরমে পৌঁছাতেই সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এটি কোনও ফতোয়া বা নির্দেশ নয়, বরং সমাজের একাংশের কাছে তাঁদের আন্তরিক ‘আবেদন’। সংগঠনের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, সমাজকে সচেতন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করতেই এই ধরনের পোস্টার লাগানো হয়েছে। মাদকবিরোধী ও অনলাইন প্রতারণার মতো বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারের অঙ্গ হিসেবেই এই পোস্টারগুলিও লাগানো হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
নিন্দায় সরব নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব
উৎসবের মুখে খাবার ও কেনাকাটার মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে এমন ধর্মীয় বিভাজনের বার্তায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শিলিগুড়ির শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকরা। সাধারণ মানুষের স্পষ্ট বক্তব্য—বাঙালির দুর্গাপূজা সার্বজনীন মিলনক্ষেত্র। এখানে কার থেকে কে কী কিনবে বা কোথায় খাবে, তা পুরোপুরি ব্যক্তিগত বিষয়।
-
তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া: পোস্টার কাণ্ডে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে শিলিগুড়ি পুরসভার মেয়র তথা প্রবীণ তৃণমূল নেতা গৌতম দেব বলেন, “ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ। সেখানে উৎসবের মুখে এমন সংকীর্ণ প্রচার সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং সংবিধানের ভাবনার পরিপন্থী।”
-
বাম নেতৃত্বের তোপ: পুরসভার প্রাক্তন মেয়র ও বর্ষীয়ান সিপিআই(এম) নেতা অশোক ভট্টাচার্য বলেন, “খাবার কেনা বা উৎসবের আনন্দের মাঝে ধর্মীয় পরিচয় খোঁজার এই মানসিকতা বাংলার সংস্কৃতির বিরোধী। সম্প্রীতি রক্ষায় প্রশাসনের অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”
-
বিজেপির দূরত্ব: অন্যদিকে, এই পোস্টারের সঙ্গে দলের কোনও যোগ নেই বলে স্পষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেছে বিজেপি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার জানান, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ পৃথক সংগঠন, বিষয়টি প্রশাসন খতিয়ে দেখবে।
উৎসবের ঠিক মুখে খাবার খাওয়া ও পুজোর সামগ্রী কেনার মতো প্রাত্যহিক বিষয়ে ধর্মের তাস খেলা নিয়ে বর্তমানে উত্তাল শিলিগুড়ির রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল।