ডিগ্রিধারীরা ডেলিভারি বয়, ইঞ্জিনিয়াররা গিগ কর্মী! দেশে কি তবে কর্মসংস্থানের নামে তৈরি হচ্ছে আধুনিক দাসত্ব?

বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতি ভারত। দেশজুড়ে চারদিকে বড় বড় পরিকাঠামো নির্মাণ, স্টার্ট-আপের রমরমা এবং সরকারি স্তরে প্রতি নিয়ত কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু মাটির আসল ছবিটা ঠিক কী? আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের জন্য সম্মানজনক, স্থায়ী এবং পর্যাপ্ত বেতনের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছি? নাকি স্রেফ স্বল্প বেতনের, নিরাপত্তাহীন অস্থায়ী শ্রমিকের এক সুবিশাল বাহিনী গড়ে তুলছি?
সম্প্রতি দেশের অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের একাংশ ভারতের চাকরির বাজারের রূপরেখা খতিয়ে দেখে এক চাঞ্চল্যকর সত্য সামনে এনেছেন। তথ্য বলছে, কর্মসংস্থান সংখ্যার দিক থেকে বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সেই কাজের মান এবং নিরাপত্তা মারাত্মক প্রশ্নের মুখে।
বেকারত্বের চেয়েও বড় আতঙ্ক: ‘আন্ডার-এমপ্লয়মেন্ট’
অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উঠে আসছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য:
-
যোগ্যতার চেয়ে অনেক নিচে কাজ: উচ্চশিক্ষিত স্নাতক, স্নাতকোত্তর এমনকি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা তরুণরাও সামান্য আয়ের জন্য ডেলিভারি বয়, কল সেন্টারের চুক্তিভিত্তিক কর্মী কিংবা রাইড-শেয়ারিং চালক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
-
স্থায়ী সুবিধার অভাব: তথাকথিত ‘গিগ ইকোনমি’ (Gig Economy) বাড়ছে ঝড়ের গতিতে। কিন্তু এই কর্মীদের নেই কোনও নির্দিষ্ট কাজের সময়সীমা, নেই পিএফ বা স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা, আর না আছে চাকরির স্থায়িত্ব।
-
স্বল্প বেতন ও নিরাপত্তাহীনতা: কর্মসংস্থানের সংখ্যা সরকারি খাতায় বাড়ছে দেখালেও, কর্মীদের গড় বেতন জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক খরচের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
“শ্রমিক তৈরি হচ্ছে, পেশাদার নয়”
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন ক্ষেত্র (Manufacturing Sector) প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি না পাওয়ায় এবং তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধা (AI)-র প্রভাবে নতুন কাজের সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ায় যুবসমাজ বাধ্য হয়ে নামমাত্র আয়ের পেশা বেছে নিচ্ছে। ফলে দেশ আসলে দক্ষ পেশাদার বা প্রযুক্তিবিদ তৈরির চেয়ে এক বিরাট অদক্ষ বা আধা-দক্ষ অস্থায়ী শ্রমিকের দল তৈরি করছে।
বিশ্বের সবচেয়ে তরুণ জনসংখ্যার দেশ ভারত। এই বিশাল ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা যুবশক্তিকে সঠিক সম্মানজনক কাজে ব্যবহার করতে না পারলে ভবিষ্যতে তা এক মারাত্মক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের চেহারা নিতে পারে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ভারতের নীতি নির্ধারকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—কেবল সংখ্যায় কত লক্ষ কর্মসংস্থান হলো তা দেখানো নয়, বরং সেই কাজের পেছনে সামাজিক সুরক্ষা ও সম্মানজনক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। তথাকথিত কর্মসংস্থানের এই ফাঁদ থেকে বের হতে না পারলে শিক্ষিত যুবসমাজের হতাশা গোটা দেশের অর্থনীতিকেই বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে।