“নীরব ঘাতক” কিডনির অসুখ! প্রস্রাব আর ত্বকের এই সাধারণ পরিবর্তনই ডেকে আনছে বিরাট বিপদ?

আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফিল্টার বা পরিশ্রুতকারক অঙ্গ হলো কিডনি। শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়া, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে কিডনির ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কিডনির অসুখকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ কিডনির কার্যক্ষমতা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট কোনো উপসর্গ বাইরে প্রকাশ পায় না।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একদম প্রাথমিক পর্যায়ে শরীর কিছু মৃদু সতর্কবার্তা পাঠায়। সঠিক সময়ে এই লক্ষণগুলি চিনে চিকিৎসা না করালে শেষ পর্যন্ত কিডনি সম্পূর্ণ বিকল (Kidney Failure) হওয়ার মতো মারাত্মক পরিণতি হতে পারে।
কিডনি সঠিকভাবে কাজ না করলে শরীরে কী কী পরিবর্তন ঘটে?
১. প্রস্রাবের ধরনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন: কিডনির সমস্যার সবচেয়ে বড় সংকেত মেলে প্রস্রাবের মাধ্যমে। রাতে হঠাৎ ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিক কমে যাওয়া কিংবা প্রস্রাবে মাত্রাতিরিক্ত ফেনা বা বুদবুদ হওয়া কিডনির সমস্যার স্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রস্রাবে ফেনা হওয়ার অর্থ শরীর থেকে জরুরি প্রোটিন বেরিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া প্রস্রাবের রঙ গাঢ় বা লালচে (রক্তের উপস্থিতি) হলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
২. পা, গোড়ালি ও চোখের চারপাশ ফুলে যাওয়া: কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম ও জলীয় তরল বের হতে পারে না। ফলে সেই অতিরিক্ত জল টিস্যুতে জমতে শুরু করে। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের পাতা ফুলে থাকা কিংবা পা, গোড়ালি ও হাতে দীর্ঘস্থায়ী ফোলাভাব (Edema) কিডনির দুর্বলতার বড় লক্ষণ।
৩. চরম ক্লান্তি, দুর্বলতা ও মনোযোগের অভাব: কিডনি ‘এরিথ্রোপোয়েটিন’ নামের একটি হরমোন তৈরি করে, যা শরীরে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) তৈরিতে সাহায্য করে। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই হরমোনের ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে রক্তাল্পতা (Anemia) তৈরি হয়। এর কারণে সামান্য পরিশ্রমেও চরম ক্লান্তি, দুর্বলতা এবং কোনো কাজে মন বসাতে সমস্যা হতে পারে।
৪. ত্বকে তীব্র চুলকানি ও শুষ্কতা: রক্তে ক্ষতিকর টক্সিন এবং বর্জ্য জমতে শুরু করলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট হয়ে যায়। শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ায় ত্বক মারাত্মক খসখসে হয়ে পড়ে এবং নাছোড়বান্দা চুলকানির সমস্যা দেখা দেয়, যা সাধারণ মলমেও সারতে চায় না।
৫. মুখে ধাতব স্বাদ, বমি ভাব ও খাবারে অরুচি: রক্তে বর্জ্য ও ইউরিয়ার পরিমাণ বেড়ে গেলে খাবারের স্বাভাবিক স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। অনেকের মুখে সারাক্ষণ এক ধরনের ধাতব স্বাদ (Metallic Taste) অনুভূত হয় এবং তীব্র অরুচির কারণে ওজন দ্রুত কমতে থাকে। এর পাশাপাশি সকালের দিকে বমি বমি ভাব বা বদহজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন আপনার কিডনি?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, কিডনি ভালো রাখতে দৈনিক পর্যাপ্ত পরিমাণ জল পান করা জরুরি। খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত কাঁচা নুন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ (Painkillers) খাওয়ার অভ্যাস অবিলম্বে ত্যাগ করা উচিত। বিশেষ করে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের বছরে অন্তত দু’বার রুটিন রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা একান্ত আবশ্যক। সামান্য সচেতনতাই পারে জীবনঘাতী কিডনি বিকল হওয়ার হাত থেকে শরীরকে রক্ষা করতে।