বিদেশের মাটিতে বাংলার জয়জয়কার! লন্ডনে বসছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় দুর্গাপুজোর মেগা আসর

বিদেশের মাটিতে দুর্গাপুজো মানেই কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, বরং তা প্রবাসীদের কাছে শিকড়ের টান, নস্টালজিয়া এবং বাঙালিয়ানাকে নতুন করে উদযাপন করার এক সুবর্ণ সুযোগ। ঢাকের বাদ্যি, ধুনুচি নাচ, চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী আলোকসজ্জা এবং খাঁটি বাঙালি খাবারের সুবাসে পরিচিত সেই পুজোর আবহ সুদূর ইউরোপের মাটিতে ফিরিয়ে আনতে চলেছে ‘বেঙ্গল হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’। আগামী ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর লন্ডনের ইলিংয়ের গানার্সবারি পার্ক স্পোর্টস হাবে জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজিত হতে চলেছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘লন্ডন শারদ উৎসব ২০২৬’। এবারের এই আয়োজনের মূল আকর্ষণ হিসেবে রাখা হয়েছে আকাশবাণী কলকাতার সম্প্রচারের শতবর্ষ উদযাপন, যা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্মৃতির মেলবন্ধনে প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি করতে চলেছে।

বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে সগর্বে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে চলেছে এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত এই সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত শারদ উৎসব ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম দুর্গাপুজোগুলি হিসেবে সুপরিচিত, যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন। প্রায় ১০ হাজার বর্গফুটের বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে এবারও থাকছে নিখুঁত পূজা-অর্চনা, চোখধাঁধানো সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ঐতিহ্যবাহী খাবারদাবার এবং ছোট থেকে বড় সকলের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। আয়োজকদের মতে, প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এই তিন দিনের উৎসব প্রবাসী বাঙালিদের ঘরে ফেরার এক তীব্র আনন্দ এনে দেবে।

এবারের উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো আকাশবাণী কলকাতার পথচলার ১০০ বছর পূর্ণ হওয়াকে সেলিব্রেট করা। ১৯২৭ সালের ২৬ অগস্ট কলকাতার বেতার সম্প্রচারের ইতিহাসে যে সোনালী অধ্যায় সূচিত হয়েছিল, তা বাঙালির দৈনন্দিন জীবন, সংবাদ, সঙ্গীত এবং নাটকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে মহালয়ার ভোরে মহিষাসুরমর্দিনীর সেই চিরপরিচিত কণ্ঠস্বর ও সুরের জাদু আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে শিহরণ জাগায়। সেই নস্টালজিয়াকেই এবার লন্ডনের পুজোর আঙিনায় জীবন্ত করে তুলতে চান উদ্যোক্তারা। বয়স্কদের কাছে এটি যেমন ফেলে আসা দিনের স্মৃতিচারণের এক দারুণ সুযোগ হবে, তেমনই ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার সমৃদ্ধ বেতার-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক অনন্য দরজা খুলে দেবে।

উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে সুসজ্জিত ‘ঠাকুর দালান’। বোধন থেকে শুরু করে সপ্তমী, মহাষ্টমী, কুমারীপুজো, সন্ধিপুজো, মহানবমী এবং দশমীর প্রতিটি পবিত্র আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হবে শারদোৎসবের সনাতন রূপ। চন্দননগরের মোহময়ী আলোকসজ্জা পুরো উৎসবের পরিবেশকে আরও বেশি বর্ণময় করে তুলবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনের জন্য থাকছে বিশেষ ‘রঙ্গমঞ্চ’, যেখানে ‘বিবিধ ভারতী’-র আদলে বাংলা গানের সন্ধ্যা এবং মুম্বই ও কলকাতার সুরের মেলবন্ধনে ‘গীতমালা’ পরিবেশিত হবে। ছোটদের বিনোদনের জন্য থাকছে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র বিশেষ উপস্থাপনা, পাশাপাশি বিএইচএফ কুইজ, অন্তাক্ষরী এবং জমজমাট ঢাক-ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ রবিবার সন্ধ্যায় বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জনপ্রিয় রেডিও জকি (RJ) মীর, যাঁর আড্ডা ও রসিকতায় উৎসবের সমাপ্তি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

বাঙালির পুজো মানেই জমিয়ে খাওয়াদাওয়া এবং অন্তহীন আড্ডা। উৎসব প্রাঙ্গণের ‘বকুল তলা’য় মিলবে খাঁটি বাঙালি ও ভারতীয় স্ট্রিট ফুডের নানা সুস্বাদু পদ। অন্যদিকে, ‘মুক্ত অঙ্গন’ হয়ে উঠবে চপ-চা আর পুরোনো বন্ধুদের আড্ডার আদর্শ ঠিকানা। শিশুদের আনন্দের জন্য থাকছে ‘খেলার অঙ্গন’ নামের বিশেষ জোন। প্রতিদিন নিয়ম করে ভক্তদের মাঝে পুজোর ভোগ বিতরণ করা হবে। সব মিলিয়ে, এই আয়োজন কেবল একটি উৎসব নয়, বরং বিদেশের মাটিতে এক সুবৃহৎ ও প্রাণবন্ত সামাজিক মিলনমেলা। ‘লন্ডন শারদ উৎসব ২০২৬’ এভাবেই বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সুদূর প্রবাসে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *