১২ বছরে খরচ ১২০ কোটি, আমানতকারীদের হাতে মাত্র ৯৬ কোটি! চিটফান্ড মামলার শুনানিতে তোলপাড় হাইকোর্ট

চিটফান্ডে কষ্টার্জিত অর্থ জমা রেখে আজও বহু মানুষ সর্বস্ব খুইয়ে টাকা ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। প্রতারিতদের সেই জমানো টাকা ফেরানোর জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও কাজের গতি কেন অত্যন্ত শ্লথ, সেই প্রশ্ন তুলে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। সাধারণ মানুষের টাকা দ্রুত ও সঠিকভাবে ফেরানোর জন্য ঠিক কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব তলব করেছে আদালত। আদালতের একগুচ্ছ কড়া প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ:চিটফান্ড মামলার শুনানিতে বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ ও বিচারপতি সুদীপ দেবের ডিভিশন বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যপদ্ধতি নিয়ে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে:কোম্পানির সঠিক হিসাব: আদালতের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, এখনও পর্যন্ত যে ১০৩টি সংস্থার দায়িত্ব কমিটির হাতে অর্পণ করা হয়েছে, তাদের অধীনে ঠিক কতগুলি কোম্পানি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শুধু রোজভ্যালিরই ৫৪টি কোম্পানি ছিল। তাই কোন কোম্পানির ঠিক কত সম্পত্তি রয়েছে এবং সেই অর্থ কোথায় লুকিয়ে রয়েছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি।
সম্পত্তি বেহাত হওয়ার আশঙ্কা: ওই সমস্ত প্রতারক সংস্থার মোট সম্পত্তির আর্থিক পরিমাণ কত, তার সঠিক হিসাব চেয়ে হাইকোর্ট সতর্ক করেছে যে, সময়মতো সম্পত্তি শনাক্ত করা না গেলে তা হাতবদল বা বিক্রি হয়ে যেতে পারে। যেমন, ডুয়ার্সে ‘ভিবজিওর’-এর প্রায় ৫৪ কোটি টাকার সম্পত্তি কমিটির নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে বিক্রি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, অথচ কমিটি কোনও পদক্ষেপ করেনি। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অগ্রাধিকার: আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, শুধু বড় অঙ্কের টাকা জমা রাখা ব্যক্তিদের কথা ভাবলে চলবে না। যাঁরা ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা জমা রেখে সর্বস্ব হারিয়েছেন, তাঁদের টাকা ফেরানোই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। বড় আমানতকারীরা আইনজীবী নিয়োগ করতে পারলেও সাধারণ গরিব মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়, তাই তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করা আদালতেরই দায়িত্ব।
বিপুল খরচ বনাম নামমাত্র পেমেন্ট:কমিটির পরিকাঠামো ও খরচ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালত জানিয়েছে, সেখানে ২৪ জন স্থায়ী কর্মী ও ১৩ জন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর কাজ করছেন। বার্ষিক প্রায় ১০ কোটি টাকা হিসাব ধরলে গত ১২ বছরে আনুমানিক ১২০ কোটি টাকারও বেশি সরকারি অর্থ খরচ হয়ে গেছে। অথচ এর বিনিময়ে আমানতকারীদের সর্বসাকুল্যে মাত্র ৯৬ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় চলা এই সংস্থার এমন হতাশাজনক পারফরম্যান্স কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছে উচ্চ আদালত।
কমিটির হাতে পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা রয়েছে এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেই দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৯ নভেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য করা হয়েছে। ওই দিন কমিটিকে সবিস্তারে জানাতে হবে যে, আগামী দিনে তারা ঠিক কোন পথে হেঁটে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।