আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত ডন হতে চেয়েছিলেন ‘ওয়েলকাম’ তারকা! হঠাৎ কী দেখে বদলে গেল জীবনের গতিপথ?

ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম রূপকার, ‘ওয়েলকাম’ ও ‘ক্রান্তিবীর’ খ্যাত কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। মাত্র ৭৫ বছর বয়সে আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল তাঁর জীবন প্রদীপ। পর্দার রুক্ষ, স্পষ্টভাষী ও শক্তিশালী অভিনয়ের বাইরেও বাস্তবের নানা পাটেকরের জীবনকাহিনী ছিল যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকে হার মানানোর মতো রোমাঞ্চকর এবং একইসঙ্গে গভীর অনুতাপ ও অনুপ্রেরণায় ভরা।

এক নজরে চোখ রাখা যাক এই কালজয়ী তারকার জীবনের কিছু অবিশ্বাস্য ও অজানা অধ্যায়ে:

১. ৩৫ টাকার বিনিময়ে সাইনবোর্ড চিত্রকর থেকে মুম্বই পুলিশের স্কেচ আর্টিস্ট

নানা পাটেকরের শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের খিদে মেটাতে স্কুল শেষে প্রতিদিন প্রায় ৮ কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে সিনেমার পোস্টার ও দোকানের সাইনবোর্ড আঁকার কাজ করতেন তিনি। সারাদিনের খাটুনির পর মিলত মোটে ৩৫ টাকা আর একবেলার খাবার।

তবে এই আঁকার পারদর্শিতাই তাঁকে অন্য এক পরিচয় দেয়। অপরাধীদের মুখের বর্ণনা শুনে হুবহু চেহারা ফুটিয়ে তোলার দুর্দান্ত দক্ষতার কারণে মুম্বই পুলিশ তাঁকে স্কেচ আর্টিস্ট (Sketch Artist) হিসেবে নিয়োগ করেছিল। জটিল সব অপরাধের আসামি ধরতে পুলিশকে সাহায্য করতেন নানা।

২. “অভিনেতা না হলে আমি আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন হতাম!”

এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে নানা পাটেকর নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, অভিনয়ের প্রতি তীব্র ভালোবাসা না থাকলে তিনি হয়তো অপরাধ জগতে পা বাড়াতেন। নিজের উগ্র মেজাজ নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি জানান, তরুণ বয়সে প্রচুর মারামারিতে জড়িয়েছেন তিনি। মুম্বইয়ের রাস্তায় মানুষ একসময় তাঁকে ভয় পেত। সেই স্বভাব থেকে বের করে অভিনেতাই তাঁকে নতুন জীবন দেয়।

                        ┌─────────────────────────────────────────┐
                        │      নানা পাটেকরের বর্ণময় জীবনপঞ্জি    │
                        └────────────────────┬────────────────────┘
                                             │
      ┌──────────────────────┬───────────────┴───────────────┬──────────────────────┐
      ▼                      ▼                               ▼                      ▼
┌───────────┐          ┌───────────┐                   ┌───────────┐          ┌───────────┐
│ পোস্টার   │          │ স্কেচ     │                   │ টেরিটোরিয়াল│          │ কৃষক বন্ধু  │
│ পেইন্টার  │ ────────►│ আর্টিস্ট   │ ────────────────► │ আর্মি     │ ────────►│ ও দাতা    │
│ (৩৫ টাকা) │          │ (পুলিশ)   │                   │ (কারগিল)  │          │ (৯০% দান) │
└───────────┘          └───────────┘                   └───────────┘          └───────────┘

৩. রিয়েল লাইফ হিরো: কারগিল যুদ্ধ ও টেরিটোরিয়াল আর্মি

১৯৯০ সালে নানা পাটেকর ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মিতে যোগ দেন। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির জন্য তিনি টানা ৩ বছর কঠিন সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় ক্যামেরা ও গ্ল্যামার জগত থেকে দূরে সরে গিয়ে সরাসরি রণাঙ্গনে ‘মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট’-এর হয়ে দেশের কাজ করেছিলেন এই দেশপ্রেমী অভিনেতা। এছাড়া রাইফেল শুটিং প্রতিযোগিতায় জাতীয় সম্মানও জিতেছিলেন তিনি।

৪. প্রথম সন্তানকে হারিয়ে আমৃত্যু অপরাধবোধ!

অভিনয়ের চূড়ায় পৌঁছালেও ব্যক্তিসত্ত্বার ভেতরে একটি গভীর ক্ষত চিরকাল বয়ে বেরিয়েছেন নানা। তাঁর বড় ছেলে দূর্বাসা জন্ম থেকেই একটি চোখে দেখতে পেতেন না এবং মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতা ছিল। মাত্র আড়াই বছর বয়সে মারা যায় শিশুটি।

পরবর্তী সময়ে চোখ ভিজিয়ে নানা আক্ষেপ করেছিলেন, “ছেলের অসুস্থতা দেখে আমি ভাবতাম লোকে কী বলবে, নানার এমন সন্তান? ওই ছোট্ট বাচ্চাটার কষ্টের কথা না ভেবে নিজের অহংকার নিয়ে ভেবেছি!” এই অনুশোচনা সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে তাঁকে।

৫. আয়ের ৯০% খরাকবলিত কৃষকদের দানে উৎসর্গ

কোটি কোটি টাকার মালিক হলেও মুম্বইয়ের ১-বিএইচকে ফ্ল্যাটে অতি সাধারণ জীবন কাটাতে ভালোবাসতেন নানা পাটেকর। ২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রে কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনায় মর্মাহত হয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘Naam Foundation’। নিজের ১.৫ কোটি টাকার গাড়ি কেনার স্বপ্ন বাতিল করে সেই টাকা কৃষকদের অ্যাকাউন্টে জমা দেন। জীবদ্দশায় নিজের উপার্জিত অর্থের প্রায় ৯০ শতাংশই তিনি অসহায় ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সেবায় বিলিয়ে গিয়েছেন।

৬. বলিপাড়ার একচ্ছত্র রেকর্ড

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে নানা পাটেকরই একমাত্র তারকা যিনি ফিল্মফেয়ারের ইতিহাসে তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন—সেরা অভিনেতা, সেরা পার্শ্ব অভিনেতা এবং সেরা খলনায়ক! এমন অনন্য কৃতিত্ব আজ পর্যন্ত আর কোনো বলিউড তারকা অর্জন করতে পারেননি।

এমনকি বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ও নানা পাটেকরের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিয়ে সিনেমা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

অভিনয়, দেশসেবা আর নিঃস্বার্থ মানব কল্যাণে ভরা এক অমলিন অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে তিনি পাড়ি দিলেন তারার দেশে। তাঁর এই লড়াই ও মহানুভবতার গল্প অমর হয়ে থাকবে চিরকাল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *